কাউন্সিলর মনোনয়নে মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ!

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:১২ এএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আসন্ন নির্বাচনে কাউন্সিলর মনোনয়নের জন্য বিসিবির গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৯.১ এর ‘ক’ এবং ‘খ’ আবশ্যিকভাবে অনুসরণের জন্য দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এই চিঠি প্রেরণ করেছেন মাঠপ্রশাসন সংযোগ অধিশাখা-এর উপসচিব মু.মাহমুদ উল্লাহ মারুফ। প্রায় অনুরূপ চিঠি বিসিবিও প্রেরণ করেছে জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে। কাছাকাছি সময়েও বেশ কিছু জেলা ও ক্রীড়া সংস্থায় গঠিত অ্যাডহক কমিটির অনুমোদন এবং অ্যাডহক কমিটিতে সদস্য পদে পরিবর্তনকেও অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এর ফলে আসন্ন বিসিবি নির্বাচনে সরকারের প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর গঠনতন্ত্র পরিপন্থী।

২৫ জন পরিচালক ৪ বছরের জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসন পরিচালনা করেন, যাদের ভেতর ১০ জন প্রতিনিধিত্ব করেন দেশের জেলা ও বিভাগকে, ১২ জন ক্লাবের প্রতিনিধি, ১ জন সাবেক ক্রিকেটার ও বিভিন্ন সংস্থা/শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি যারা নিজ নিজ ক্যাটাগরি থেকে নির্বাচিত হয়ে আসেন। বাকি ২ জনকে সরাসরি মনোনয়ন দেয় এনএসসি বা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। ক্লাবের প্রতিনিধিদের নির্বাচনে ভোট দেন ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস-এর সর্বশেষ মৌসুমের প্রিমিয়ার, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে অংশ নেওয়া প্রত্যেকটি ক্লাবের ১ জন করে প্রতিনিধি। এই ক্যাটাগরিতে সাধারণ ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক, দাতা বা মালিকপক্ষের কেউই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তবে ক্যাটাগরি-১ অর্থাৎ আঞ্চলিক ও জেলা ক্রিকেট সংস্থার প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আছে প্রশ্ন। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে ২১ আগস্ট ২০২৪ সালে দেশের সব সরকারি ক্রীড়া সংস্থা ভেঙে দেওয়া হয়। ছাত্র প্রতিনিধি, সাংবাদিকদের সঙ্গে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকদের সম্পৃক্ত করে ৭ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন এবং সেই কমিটি এনএসসি থেকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই অ্যাডহক কমিটি নিয়েই বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। 

কুমিল্লায় ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের লোক দিয়ে গঠন করা কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করেছেন জেলার ক্রীড়াঙ্গনের খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার ও সংগঠকরা। এ সময় কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিব বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন তারা। ফেনী জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিতর্কিত আহ্বায়ক কমিটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করেছেন জেলার সম্মিলিত খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকরা। একই অবস্থা, রাঙ্গামাটি, ঝালকাঠি, লক্ষ্মীপুর-সহ অনেক জেলায়। যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটিতে সাবেক সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের ছোট ভাই ও প্রাক্তন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক কাজী ইনাম আহমেদকে সদস্য করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জেলা ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক-বর্তমান খেলোয়াড়রা একত্র হয়ে জেলা প্রশাসক এবং ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক ও আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা না থাকায় বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাই এই ভূমিকায় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদাধিকারবলে প্রধান বিভাগীয় কমিশনার। এই আমলাদের মনোনীত ব্যক্তিরাই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন আঞ্চলিক ও জেলা ক্রিকেট সংস্থার প্রতিনিধি ১০ জন পরিচালককে। তাই তাদের কাছে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ বলেই মনে করছেন অনেকে।

বিসিবি’তে কাউন্সিলর হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সবশেষ সময় শেষ হবে শুক্রবার ১৯ সেপ্টেম্বর, যা ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বর্ধিত করা হয়েছে। তার আগেভাগে, ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে ৭টি অ্যাডহক কমিটির পরিবর্তন অনুমোদন করেছে এনএসসি, ৯ তারিখে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৯টি অ্যাডহক কমিটির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা সদস্য পরিবর্তনের। নির্বাচনকে সামনে রেখে অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের অনুরোধ পরোক্ষভাবে ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনে সরকারের হস্তক্ষেপেরই ইঙ্গিত বহন করে। সম্ভাব্য একজন কাউন্সিলর দেশ রূপান্তরকে বলেছেন যে তিনি জানতে পেরেছেন অ্যাডহক কমিটির ভেতর থেকেই কাউন্সিলর মনোনয়ন দিতে হবে, এমন একটা নির্দেশনা আছে ওপর মহল থেকে। তার আভাসও মিলেছে ঢাকার বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থায় আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে, কারণ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিকে দেশের একটি বিভাগের ক্রীড়া সংস্থায় সদস্য করার কোনো নজির নেই। এই পদ্ধতিতে ক্যাটাগরি-১ এর ১০ পরিচালক নির্বাচনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে সরকার, সঙ্গে এনএসসি কোটায় আরও ২ জন পরিচালক মনোনয়নের মাধ্যমে ২৫ সদস্যের বোর্ডে বজায় রাখতে পারে প্রাধান্য। আইসিসির গঠনতন্ত্রের ২.৪ এর ধারায় বলা হয়েছে স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কথা, সরকারের প্রভাবমুক্ত সংগঠন পরিচালনার কথা। এভাবে আমলাতন্ত্রের নেতৃত্বাধীন অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে যদি পরিচালকরা নির্বাচিত হন, তাহলে ক্রিকেট প্রশাসনে সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রভাব থাকাটা মোটেও অমূলক নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত