ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে নারীদের অবদান অনেকাংশে উপেক্ষিত হলেও কিছু ব্যতিক্রমী মহাপুরুষ-মহানারীদের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটি হলো রাবেয়া আল বসরি। ৮ম শতকের এই সুফি সাধিকা শুধু নারীদের মধ্যেই নয়, গোটা সুফি পরম্পরায় এক অন্যতম পথপ্রদর্শক। তার প্রেমময় ঈশ্বরচিন্তা, আত্মবিসর্জনমূলক সাধনা, এবং ভক্তিময় কবিতাগুচ্ছ সুফিবাদের মৌল আত্মাকে তুলে ধরে।
রাবেয়ার জন্ম ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে (৯৫ হিজরি) বর্তমান ইরাকের বসরা শহরে। তিনি ছিলেন এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণকারী চতুর্থ কন্যা সন্তান, তাই তার নাম রাখা হয় ‘রাবেয়া’, যার অর্থ ‘চতুর্থ’। শিশুকালে বাবা-মাকে হারিয়ে তিনি চরম দারিদ্র্য ও দুঃখের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। কিছু সময়ের জন্য ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি হন। এক কঠোর হৃদয়ের প্রভুর অধীনে তিনি দাসী হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু রাবেয়ার ধ্যানমগ্নতা ও আত্মার দীপ্তি দেখে সেই প্রভু এক রাতে কেঁদে ফেলেন। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রাবেয়াকে মুক্ত করে দেন।
মুক্তির পর রাবেয়া বসরার উপকণ্ঠে নির্জন জীবনযাপন শুরু করেন। ভিক্ষাভোজিনী হলেও কারও দ্বারে যান না। প্রতিদিন রাত তিনি নামাজ, ধ্যান ও প্রার্থনায় কাটান। কখনো কখনো দিনের পর দিন উপবাস করতেন। তাকে অনুসরণ করে অনেক নারী-পুরুষ পথ খুঁজে পান ঈশ্বরভক্তির।
রাবেয়া সুফিচেতনায় ‘ঈশ্বরপ্রেমের ধর্ম’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আল্লাহকে ভয় করে নয়, ভালোবাসা দিয়ে ইবাদতের কথা বলেন। তার বিখ্যাত উচ্চারণ ‘হে আল্লাহ, যদি তোমার ভয়েই আমি তোমার ইবাদত করি, তবে আমাকে জাহান্নামে দাও। যদি আমি জান্নাতের আশায় ইবাদত করি, তবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করো। কিন্তু যদি আমি শুধু তোমাকেই ভালোবেসে ইবাদত করি, তবে আমাকে তোমার সৌন্দর্যে ভাগ দাও।’
এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের প্রচলিত বেহেশত-দোজখ-কেন্দ্রিক চিন্তার বিপরীতে এক অনন্য পথ দেখায়, যে পথকে বলা যেতে পারে ‘প্রেমের ইবাদত’।
রাবেয়া চরম নির্লিপ্ত ও আত্মনিবেদিত ছিলেন। দুনিয়ার কোনো কিছুই তাকে প্রলুব্ধ করতে পারত না। নিজের সত্তাকেই বিলীন করে দিতে চাইতেন তিনি ঈশ্বরস্বরূপ প্রেমে।
যদিও তিনি নারী ছিলেন, সুফিবাদে তার অবস্থান একেবারে পুরুষ আধ্যাত্মিক গুরুদের সমান। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, নারীও পূর্ণরূপে আল্লাহর বন্ধু হতে পারেন। এটা সুফিবাদে নারীর আত্মিক অবস্থানের পক্ষে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
রাবেয়া হলেন প্রেমভিত্তিক সুফিবাদের প্রথম প্রধান ব্যাখ্যাতা। তার দর্শন-পরবর্তী সুফি সাধক, যেমন হাসান আল বসরি, আল-হাল্লাজ, রুমী, আত্তার সবার চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি যে প্রেমভিত্তিক ঈশ্বরচিন্তা ও সাধনার পথ দেখিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তার চিন্তা, প্রার্থনা ও জীবনানুভূতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে পরমপ্রেম ‘ইলাহি মহব্বত’-এর মধ্যেই রয়েছে চূড়ান্ত আত্মমুক্তি ও পরিতৃপ্তি।
রাবেয়া নিজে কবিতা রচনা করেছেন কিনা তা বিতর্কিত হলেও তার নামাঙ্কিত বহু সুফি কবিতা ও প্রার্থনা পাওয়া যায়। এখানে কিছু প্রসিদ্ধ উদাহরণ ও তার অনুবাদ তুলে ধরা হলো।
১
আমি হৃদয়ে তোমাকেই রেখেছি আলাপকর্তা,
আর শরীরটি উন্মুক্ত করেছি বাহিরের জন্য।
শরীরটা তাদের জন্য, যারা আমার পাশে বসে,
কিন্তু আমার হৃদয়ের প্রিয়, সে কেবল তোমার সঙ্গী।
২
তোমাকে ভালোবেসেছি দুইভাবে: একটির ধরন স্বার্থপর,
অন্যটি তোমার মহিমার সঙ্গে মানানসই।
যে প্রেম স্বার্থপর সেটাতে আমি
তোমার মধ্যে লিপ্ত হয়ে যাই,
বাদ দিই অন্য সব কিছু।
যে প্রেম তোমার যোগ্য
সেটায় তুমি
উন্মোচিত কর আবরণ
যেন আমি
দেখতে পাই তোমাকে।
এ রকম বা ওরকম
কোনোটাতেই
প্রশংসা আমার কিছু নাই।
সকল প্রশংসা তোমারই:
হোক প্রেম এ রকম
কিংবা ওরকম।
৩
দোজখের ভয়ে যদি করি আমি প্রার্থনা,
দোজখেই তবে পোড়াও আগুনে আমাকে।
বেহেশত পাওয়ার লোভে যদি করি প্রার্থনা,
জান্নাত হতে দূরে রাখো তুমি আমাকে।
তোমাকে, কেবল তোমাকেই, পেতে নিকটে
যদি করে থাকি আমার সকল প্রার্থনা,
তোমার অতুল সৌন্দর্যের উপভোগ হতে, প্রিয়,
করো না, করো না বঞ্চিত তুমি আমাকে।
৪
আমার আত্মায় আছে মন্দির, মাজার
আছে গির্জা, মসজিদ, যেখানে সেজদা দেই।
প্রার্থনা আমাদের এমন এক বেদিতে নিয়ে যাক,
যেখানে কোনো দেয়াল কিংবা নাম নাই
প্রেমের কি এমন এলাকা নাই যেখানে
কর্র্তৃত্বের কোনো কিছু নাই?
প্রেমানন্দ যেখানে ঝরে পড়ে আপনারই মাঝে
আর মিলিয়ে যায়।
যেখানে কেবল ডানা আছে, পূর্ণ জীবন্ত,
কিন্তু কোনো মন নাই, দেহ নাই।
আমার আত্মায় আছে মন্দির, মাজার,
আছে গির্জা, মসজিদ
যা ডুবে যায় ডুবে যায় আল্লাহর মাঝে।
৫
ওগো প্রভু, যদি দোজখে পাঠাও
আমাকে সে কেয়ামতে
ফাঁস করে দেব এমন গুপ্তকথা
দৌড়ে দোজখ চলে যাবে দূরে
আমার নিকট হতে।
৬
ওগো প্রভু, এই দুনিয়ার যত কিছু, দিতে চাও তুমি আমাকে, সকলই বিলাও শত্রুমাঝে।
ওগো প্রভু, আখেরাতে, যা কিছু আমাকে দিতে চাও,
সবই বিলাও বন্ধুমাঝে।
আমার জন্য কেবল এটুকু রেখো: তুমি শুধু তুমি থেকো।
৭
হৃদয়ে দারুণ যন্ত্রণা আর একাকিত্বের ক্ষত,
সারাতে পারে না হেকিম-বৈদ্য, হৃদয়ের ব্যথা যত।
একটিই পথ আছে আরোগ্য পেতে:
নিত্য মিলনে থাকা চাই শুধু বন্ধুজনার সাথে।
৮
আমি একজন দরোয়ান হিসেবে পুরোপুরি যোগ্য, কারণটা এই: যা আমার ভেতরে আছে, তা আমি বাইরে যেতে দিই না। আর যা বাইরে আছে, তা আমি ভেতরে আসতে দিই না। যদি কেউ ভেতরে আসেও, সে আবার বেরিয়ে যায়।
তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি হৃদয়ের দরজা পাহারা দিই ভেজা মাটির পিণ্ড নই।
৯
আমি এক হাতে একটি মশাল রাখি,
আর অন্য হাতে এক বালতি জল।
এই দুটি নিয়ে আমি বেহেশতকে আগুনে পুড়িয়ে দেব,
আর দোজখের আগুন নিভিয়ে দেব
যাতে যারা ঈশ্বরের পথে যাত্রা করছে,
তারা পর্দাগুলি ছিঁড়ে ফেলতে পারে
আর দেখতে পারে আসল লক্ষ্য।
১০
হে প্রভু, আরেকটি রাত চলে যাচ্ছে,
আরেকটি দিন উদয় হচ্ছে
আমাকে বলো, আমি কি রাতটা ভালোভাবে কাটিয়েছি তাহলে আমি শান্তি পাবো,
নাকি আমি তা নষ্ট করেছি তাহলে আমি যা হারিয়েছি তার জন্য শোক করব।
আমি শপথ করি, যেদিন তুমি প্রথম আমাকে জীবিত করেছিলে,
যেদিন তুমি আমার বন্ধু হয়েছিলে
সেদিন থেকে আমি আর ঘুমাইনি।
আর তুমি যদি আমাকে তোমার দরজা থেকে তাড়িয়ে দাও,
তবুও আমি আবার শপথ করি আমরা কখনো আলাদা হব না।
কারণ তুমি আমার হৃদয়ে জীবিত আছো।
