নতুন বিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছে ইউক্রেন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোতে। এ বিপ্লবের নেতা নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার নেই, আছে শুধু একদল তরুণ-তরুণী। যারা পরিচিত ‘জেন জি’ বা ‘জেনারেশন জেড’ নামে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম এখন, পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তাদের দাবি একটা সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। কিন্তু এই ঢেউ কি এখানে থামবে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইউক্রেন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। ইউক্রেনে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে, তরুণদের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। ২০১৪ সালের ইউরোমাইদান বিপ্লবে (Euromaidan Revolution) তরুণদের নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো, যা দেশটির তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা তরুণদের হতাশ করেছে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পর তরুণরা ব্যাপক বিক্ষোভে অংশ নেয়। এটি প্রমাণ করে, তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনে কতটা আগ্রহী। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে, জেন জি-দের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভ দেশটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
২০২২ সালের ‘গোটা গো গামা’ (Gota Go Gama) আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ সমাজ, যারা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। আর বাংলাদেশ ও নেপালে রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, পুরনো রাজনৈতিক মডেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন (২০১৮) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন (২০১৮) এর প্রধান অংশগ্রহণকারী ছিল তরুণ শিক্ষার্থী। এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে, ভিন্ন ধারার আন্দোলনের জন্ম দেয়। নেপালে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে তরুণরা ক্রমাগত হতাশ হয়ে উঠছে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো তরুণ প্রজন্মের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। এবার তরুণ আন্দোলনের ধোঁয়া উড়তে যাচ্ছে ভারতে। বিশাল তরুণ জনসংখ্যা, বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট প্রদেশে, এ ধরনের আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে। উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের মতো প্রদেশগুলোতে এ সম্ভাবনা বেশি। দুটি প্রদেশই ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, সীমিত শিল্পায়ন এবং ব্যাপক দুর্নীতি প্রদেশগুলোর তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। উপরন্তু, সামাজিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক মেরূকরণ এ ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। জেন জি-রা এই হতাশাকে পুঁজি করে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। তারা হয়তো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করবে না, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা এমন একটি জনমত তৈরি করবে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে। সরাসরি কোনো প্রমাণ না থাকলেও, কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে এ উত্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা বিভিন্ন এনজিও এবং সিভিল সোসাইটি গ্রুপকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে, যারা গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য কাজ করে। গ্রুপগুলো অনেক সময় তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং তাদের সংগঠিত করতে সাহায্য করে। আন্দোলনগুলো সাফল্যের পেছনে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোরও একটি ভূমিকা আছে। ২০২১ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৮৭ শতাংশ তরুণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে খবর এবং তথ্য পায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের কাছে তথ্যের প্রধান উৎস। ফেসবুক, টুইটার এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে, যা আন্দোলনকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। এ আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামাজিক এবং
সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে। জেন জির কাছে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো যেমন জাতি, ধর্ম বা গোত্রভিত্তিক পরিচয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ চায়, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে। এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর, বিভাজনমূলক রাজনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জেন জি-রা শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক মাধ্যমের সাহায্যে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করছে। যা রাজনৈতিক প্রতিবাদকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জেন জি-দের পরিবেশ সচেতনতা। জেন জি-দের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি দিক হলো, নেতৃত্বের ধরন। তারা কোনো একক নেতা বা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না। বরং, একটি বিকেন্দ্রীভূত (decentralized) এবং স্বতঃস্ফূর্ত spontaneous) নেতৃত্বের মডেল অনুসরণ করে। তরুণরা ‘ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম’-এর মাধ্যমে দ্রুত জনমত গঠন এবং কার্যকরভাবে বিভিন্ন বিষয়ে সাড়া দিতে সক্ষম। তাছাড়া, জেন জি-রা রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন ধরনের ভাষা এবং কৌশল ব্যবহার করছে। তারা প্রচলিত রাজনৈতিক স্লোগান বা আদর্শের পরিবর্তে মেমস (memes), ট্রোল trolls) এবং ভাইরাল হ্যাশট্যাগ viral hashtags)-এর মতো ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২০ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT) থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে এ ধরনের ডিজিটাল সরঞ্জামগুলো রাজনৈতিক তথ্যকে আরও আকর্ষণীয় এবং বোধগম্য করে তোলে। যা তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়ায়। কৌশলগুলো পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তারা এই ধরনের ডিজিটাল ভাষা এবং সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নয়। জেন জি-রা তাদের রাজনৈতিক অসন্তোষকে ব্যঙ্গাত্মক এবং হাস্যরসের মাধ্যমে প্রকাশ করে, যা তাদের আন্দোলনকে আরও মানবিক এবং সহানুভূতিশীল করে তোলে।
যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা বিপুল, ফলে তাদের ভোট রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক (IDEA (International Institute for Democracy and Electoral Assistance)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো দেশগুলোতে মোট ভোটারের ৬০ শতাংশেরও বেশি ৩০ বছরের কম বয়সী। এই তরুণ ভোটাররা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে প্রার্থীর যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক নীতি বিবেচনা করে ভোট দিতে বেশি আগ্রহী। এটি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী কৌশল এবং নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করছে। যেসব দল জেন জি-দের দাবি-দাওয়া এবং মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেবে, তারাই ভবিষ্যতে নির্বাচনে ভালো ফল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেন জি-দের এই রাজনৈতিক সক্রিয়তার একটি প্রধান কারণ হলো, তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ। ২০২৩ সালে ডেটা ওআরজি (Data.org) দ্বারা পরিচালিত একটি জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ তরুণ মনে করে যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ। এই প্রযুক্তিনির্ভরতা তাদের মধ্যে একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করেছে, যেখানে তথ্যের উৎস এবং সত্যতা যাচাই করা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দোলনের পুরো প্রক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। জেন জি-রা পুরনো রাজনৈতিক স্লোগান এবং আদর্শে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় সরাসরি ফল, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন। ফলে, যেসব রাজনৈতিক দল পুরনো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে ধরে আছে, তারা প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। নতুন প্রযুক্তিবান্ধব এবং তরুণ-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্মের উত্থান ঘটবে। জেন জি-দের নেতৃত্ব প্রচলিত নেতাদের মতো হবে না। তারা হয়তো কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হবে না, এমনকি তাদের কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকবে না। বরং তারা সমাজের সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। এই নেতৃত্ব হবে আরও বেশি স্বচ্ছ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। জেন জি-রা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনই চায় না, তারা চায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের ৭০ শতাংশেরও বেশি মনে করে যে, দেশের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ। এই আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করবে দাবিগুলো পূরণ করতে। এর ফলে এই ধরনের অঞ্চলে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নীতি প্রণীত হতে পারে, যা হবে আরও বেশি জনমুখী।
এই পরিবর্তনের পথে বাধা আছে। পুরনো রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করবে। তাদের বিভক্ত করার চেষ্টা করবে এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে আন্দোলনকে কলুষিত করার চেষ্টা করতে পারে। উপরন্তু, একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন ধরে রাখা কঠিন। জেন জি-দের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতে পারে এবং তাদের আগ্রহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যেতে পারে। তাই এ পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটবে। ঔবহ ত’র নীরব বিপ্লব কেবল রাজনীতির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। তারা পুরনো দিনের রাজনৈতিক বিভাজন ও দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও নীতির ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব মত প্রকাশ করছে। এ প্রজন্ম ধর্ম, জাতি বা গোত্রের পরিচয় থেকে নিজেদের আলাদা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে আগ্রহী। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং পরস্পরের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে, যা ঐতিহ্যবাহী বিভেদকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জেন জি-দের এই উত্থান, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করছে। মনে রাখতে হবে, এটি কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং একটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। এ প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে নিতে চায়। এ পথ হয়তো সহজ হবে না, কিন্তু এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দেবে।
লেখক: কলাম লেখক, সিইও ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
