শিক্ষকের ন্যায্য দাবি : রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:২৮ এএম

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন অভূতপূর্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের শিক্ষক সমাজ যাদের হাত ধরে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি হয়, সমাজে আলোর দিশা আসে, নতুন প্রজন্ম গড়ে ওঠে সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে। অথচ এই জাতি গঠনের কারিগররা নানাবিধ অবহেলা, বঞ্চনা আর অস্থিরতার শিকার হয়ে রাজপথে নেমেছেন। একদিকে শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সমাধানের অভাবে শিক্ষাঙ্গন অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এ প্রশ্ন আজ সবার যারা কলম হাতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলো জ্বালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের কেন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে স্লোগান দিতে হবে? কেন তারা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন? এটি কেবল শিক্ষকদের দুর্দশার গল্প নয়, বরং একটি জাতির সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি।

আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও প্রেক্ষাপট : শিক্ষকদের দাবি অযৌক্তিক নয়। তারা বলছেন একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো থাকতে হবে, যেখানে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য থাকবে না। বাস্তবে দেখা যায়, সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষকরা সুবিধা ও বেতনে অর্ধেক বা তার চেয়েও কম পান। একই যোগ্যতা, কাজ এবং দায়িত্ব পালন করেও এই বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে চলছে। শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ হলো বেতন বৈষম্য : সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক ব্যবধান। সুবিধার অভাব : সরকারি শিক্ষকরা বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা পান, কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকরা এসব সুবিধা পান নামে মাত্র। জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি : বারবার জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় শিক্ষকদের জীবনে চাপ বাড়াচ্ছে। শিক্ষকদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে তারা শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য আন্দোলন করছেন না, মর্যাদা ও সম্মানের দাবি তুলছেন। সমাজে যারা জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে বিবেচিত, তাদের জীবনযাত্রা যদি ন্যূনতম মানেও টিকে না থাকে, তাহলে কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তুলবেন?

শিক্ষার ওপর প্রভাব : শিক্ষকের আসল জায়গা হলো শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু তারা যখন রাজপথে আন্দোলনে বসেন, তখন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীরা অসহায় হয়ে পড়ে, তাদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকন্তু শিক্ষার্থীদের সামনে এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা যায়। তারা দেখতে পান তাদের শিক্ষকরা নিজেদের ন্যূনতম অধিকার আদায় করতে সংগ্রাম করছেন। এতে নতুন প্রজন্মের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘শিক্ষক হয়ে কী লাভ? এই পেশায় কি সম্মান বা মর্যাদা আছে?’ এর ফলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আগে শিক্ষকতা ছিল সমাজে এক মর্যাদার পেশা। এখন অনেকেই ভাবছেন ‘এত কষ্ট করে শিক্ষক হয়ে লাভ কী? জীবনযাপনই যখন সম্মানের সঙ্গে সম্ভব নয়।’ এর ফলেই শিক্ষকতা দ্বিতীয় শ্রেণির পেশায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সরকারের দায়িত্ব : সরকার প্রায়ই ঘোষণা দেয় ‘শিক্ষা হলো উন্নয়নের চালিকাশক্তি’। কিন্তু বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয় না। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অনেক কম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির ৬% শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুপারিশ থাকলেও, বাংলাদেশে তা ২%-এরও নিচে সীমাবদ্ধ। বরাদ্দের বড় অংশ যায় অবকাঠামো উন্নয়নে, কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় হয় অতি সামান্য। সরকারের দায়িত্ব দুটি দিক জরুরি নীতিগত দায়িত্ব : শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর করে, একীভূত কাঠামো তৈরি করা। নৈতিক দায়িত্ব : জাতি গঠনের কারিগরদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে, তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করা।

সম্ভাব্য সমাধান : শিক্ষকদের আন্দোলনের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। এ জন্য কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আর তাদের রাজপথে নামতে হবে না একক বেতন কাঠামো প্রণয়ন, সরকারি শিক্ষকদের মতো বেসরকারি শিক্ষকদের সমান সুযোগ ও সুবিধা নিশ্চিত করা, মানসম্মত বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা চালু করা, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো এবং  জাতির উন্নয়নে প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা। বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষক সমাজ সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন সবক্ষেত্রে তারা ছিলেন সামনের সারির যোদ্ধা। অনেক শিক্ষক জীবন দিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, আবার অনেকে ছিলেন আন্দোলনের নীরব প্রেরণার উৎস। ইতিহাস প্রমাণ করে, শিক্ষকদের দাবি কখনো শুধু ব্যক্তিগত ছিল না; বরং জাতির বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গেই জড়িত। অথচ দুঃখজনকভাবে স্বাধীনতার এত বছর পরও, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়নি।

শিক্ষক আন্দোলনকে শুধু একটি পেশাজীবী শ্রেণির দাবি হিসেবে দেখা যাবে না। এটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। শিক্ষকরা যদি ভালো না থাকেন, শিক্ষার মান কখনো উন্নত হবে না। শিক্ষকের হাতে কলম-বই দিন, সেøাগান-ব্যানার নয়। তাদের জায়গা রাজপথে নয়, শ্রেণিকক্ষে। সরকার যদি দূরদর্শী নীতি নেয়, তবে শিক্ষকরা রাজপথে নামবেন না, বরং শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোর পথে হাঁটবেন। শিক্ষককে অবহেলা মানে শিক্ষাব্যবস্থাকে অবহেলা করা, আর শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা মানে গোটা জাতির দুর্বলতা। এখনই সময় শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রতিধ্বনি শুনে সমাধানের সোপান তৈরি করার। তাদের ন্যায্য দাবি পূরণ হলে, তবেই টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

লেখক : প্রভাষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত