ফিলিস্তিন প্রশ্ন আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের একটি। এর শেকড় নিহিত রয়েছে বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে যখন মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুনর্গঠনের মাধ্যমে, একদিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছিল এবং অন্যদিকে স্থানীয় জনগণ তাদের নিজস্ব ভূমি, অধিকার ও পরিচয় রক্ষার লড়াই করছিল। আজকের দিনে ফিলিস্তিন কেবল একটি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক ন্যায়নীতি এবং শক্তির রাজনীতির এক প্রতীক। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপ্রাপ্তির দাবি যেমন ঐতিহাসিকভাবে বৈধ, তেমনি তাদের দমন-পীড়নের ইতিহাসও অভূতপূর্ব। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের ফিলিস্তিন স্বীকৃতি ঘোষণা, এই সংকটকে নতুন আলোচনায় নিয়ে এসেছে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ আসে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের হাতে। ১৯১৭ সালের বালফোর ঘোষণা ফিলিস্তিন সংকটের প্রথম আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে, যেখানে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতি দেয় ইহুদি জনগণের জন্য এই ভূখণ্ডে একটি জাতীয় নিবাস গড়ে তোলার। অথচ সে সময় ফিলিস্তিনে আরব জনগণই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে শুরু থেকেই এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসি গণহত্যার পর, ইহুদিদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে সহানুভূতি প্রবল হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো তাকে দ্রুত স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রতিশ্রুত রাষ্ট্রের জন্ম আর হয় না। বরং ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়ে পড়ে, যাদের অধিকাংশ আজও ফিরে যেতে পারেনি। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডগুলো, কার্যত দখলকৃত অবস্থায় আছে। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের এসব অঞ্চল থেকে সরে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে, গাজা কার্যত একটি খোলা কারাগারে পরিণত হয়েছে এবং পূর্ব জেরুজালেম পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। এই দখলদারিত্বই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলন নানা ধাপ অতিক্রম করেছে। ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা জাতিসংঘে পর্যবেক্ষক মর্যাদা লাভ করে, আর ২০১২ সালে ফিলিস্তিনকে ‘non-member observer state’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আজ পর্যন্ত বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের পাশে রয়েছে। তবে পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি এবং দীর্ঘদিন ব্রিটেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে গড়িমসি করেছে। এর ফলে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ এখনো আটকে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি এবং ধ্বংসযজ্ঞ ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। গাজা উপত্যকা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ অবরোধের শিকার। সাগর, আকাশ ও স্থল সব দিক থেকেই অবরুদ্ধ এই ছোট্ট ভূখণ্ডে দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ অমানবিক অবস্থায় বসবাস করছে। চিকিৎসা, খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ সবকিছুর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালাচ্ছে ইসরায়েল। যখনই কোনো সামান্য অজুহাত পাওয়া যায়, তখনই গাজার ওপর নির্বিচারে বিমান হামলা চালানো হয়।
২০২১ সালের মে মাসে মাত্র ১১ দিনে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ছিল। এরপর ২০২৩-২৪ সালের সংঘাতে পুরো গাজা নগরী প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার শিশু নিহত হয়, লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। স্কুল, হাসপাতাল, শরণার্থী ক্যাম্প কোনো জায়গাই রেহাই পায়নি। পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও সমান ভয়াবহ। সেখানে প্রতিনিয়ত ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান, গ্রেপ্তার, গুলি করে হত্যা এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনিদের জমি ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এসব কর্মকাণ্ডকে, আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বললেও কার্যত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ব্যবহার করে ইসরায়েলকে রক্ষা করছে। ফলে একতরফাভাবে ফিলিস্তিনিরা দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে, তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে। এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুধু ভৌত অবকাঠামো ধ্বংস করছে না, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করছে। গাজার শিশুদের প্রজন্ম যুদ্ধের মধ্যে বেড়ে উঠছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, মানসিক আঘাত তাদের সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ফিলিস্তিনের অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে ন্যূনতম অবকাঠামো ও মানবসম্পদ প্রয়োজন, তা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে, কারণ যদি এখনই ফিলিস্তিনের প্রশ্নে বিশ্ব একতাবদ্ধ না হয়, তবে একদিন হয়তো রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি নষ্ট হয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের কিছু দেশ ইতিমধ্যেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, স্পেন এবং সেøাভেনিয়া ২০২৪ সালে এ সিদ্ধান্ত নেয়। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দেন, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের আগে ব্রিটেনও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, কারণ ফিলিস্তিন প্রশ্নের জন্মলগ্নেই ব্রিটেনের ভূমিকা ছিল প্রধান। ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, বালফোর ঘোষণা এবং ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পেছনে লন্ডনের তৎকালীন নীতি ছিল মুখ্য চালক। আজ সেই দেশ বহু দশক পর, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এ যেন ঐতিহাসিক দায় স্বীকারের এক দৃষ্টান্ত।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের ঠিক আগে, ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ফ্রান্স। এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও পর্তুগালের পর ফ্রান্সও পশ্চিমা দেশগুলোর সেই তালিকায় যোগ দিল, যারা সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে নৈতিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি বাস্তব রাজনীতি। দেশে দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমত বেড়েছে। ছাত্র আন্দোলন, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবাদ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের শক্তিশালী কণ্ঠ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। গাজার ভয়াবহ যুদ্ধকালে ব্রিটেনে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। ফলে নতুন লেবার সরকার বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারেনি। এই স্বীকৃতির প্রতীকী গুরুত্ব বিশাল। ব্রিটেনের মতো একটি প্রভাবশালী দেশ, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে ইউরোপের অন্যান্য দেশও উৎসাহিত হবে একই পদক্ষেপ নিতে। ইতিমধ্যে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। তবে ব্রিটেনের স্বীকৃতি মানেই যে, ফিলিস্তিন এখনই পূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে, তা নয়। ইসরায়েলের দখলদারিত্ব, অবৈধ বসতি, গাজার ধ্বংস এবং পূর্ব জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ সবই রয়ে গেছে। তা ছাড়া ফিলিস্তিনি নেতৃত্বও বিভক্ত। গাজায় হামাস এবং পশ্চিম তীরে ফাতাহর দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রীয় ঐক্যকে দুর্বল করে রেখেছে। তাই আন্তর্জাতিক সমর্থনকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই স্বীকৃতির অর্থ আরও গভীর। আজকের পৃথিবী মেরুকৃত। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে সরব, অথচ ফিলিস্তিনিদের একই অধিকার দাবি উপেক্ষা করে। এই দ্বিমুখিতা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে।
আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো প্রশ্ন তুলছে : যদি ইউক্রেনের জনগণ স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার পায়, তবে ফিলিস্তিনিরা কেন পাবে না? ব্রিটেনের স্বীকৃতি এই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করে তুলেছে। আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এই সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে। যদিও আরব বিশ্বের ভেতরে বিভাজন আছে এবং কিছু দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, সাধারণ জনগণ এখনো প্রবলভাবে ফিলিস্তিনের পাশে। সৌদি আরবও স্পষ্ট জানিয়েছে, ফিলিস্তিন প্রশ্ন সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবে না। ব্রিটেনের স্বীকৃতি সেই অবস্থানকে আরও শক্তি জোগাবে। রাশিয়া ও চীনের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিয়ে আসছে, কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে। চীনও সাম্প্রতিক সময়ে আরব বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে সক্রিয় হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের সিদ্ধান্ত কেবল পশ্চিমা রাজনীতিতে নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন প্রভাব ফেলবে। ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন শুধু একটি আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং বিশ্বরাজনীতির নৈতিকতার পরীক্ষাপত্র। ব্রিটেনের সিদ্ধান্ত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ফিলিস্তিনিদের মুক্তি এনে দেবে না, কিন্তু এটি একটি বড় প্রতীক। ব্রিটেনের এই স্বীকৃতি, তাই ভবিষ্যতের সেই মুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
লেখকঃ মনোবিজ্ঞানী
