উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে বার্সেলোনার সাবেক কোচ জাভি হার্নান্দেজ ২০২১ সালে বলেছিলেন, ‘সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হতে পারে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো তখন অনেকের কাছেই অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল। কারণ তখন দেম্বেলের ইনজুরি, শৃঙ্খলার অভাব, পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তাকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছিল। তবে ২০২৪-২৫ মৌসুমটা দারুণ কাটান দেম্বেলে, ফলে ২০২৫ ব্যালন ডি’অর জয়ের মধ্য দিয়ে জাভির সেই কথাই যেন বাস্তব হয়ে উঠল।
দেম্বেলের বাবা-মা ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার অভিবাসী। ছেলের বয়স যখন ছয় বছর দেম্বেলের মা ফাতিমাতা উসমান তাকে নিয়ে যান রেন শহরে ফুটবলার মামা বাদু সামবাগের কাছে। মামা তাকে স্থানীয় ক্লাব এভ্রু’তে ভর্তি করান, সেখান থেকেই শুরু। পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু রেনে থেকে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড এরপর বার্সেলোনা থেকে পিএসজি সব জায়গায় ছেলের ক্যারিয়ারের চালিকাশক্তি ছিলেন দেম্বেরের মা। বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ২০১৭ সালে ১০৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে যোগ দেন বার্সেলোনায়। বনে যান বিশ্বের অন্যতম দামি ফুটবলার। কিন্তু সেই উজ্জ্বল সূচনার পরেই নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার। ১৪ বার পেশির চোটে প্রায় ৭৮৪ দিন মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। এছাড়া অনুশীলনে দেরি করা, রাত জাগা, গেমস খেলা এ সব নিয়ে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাজনিত প্রশ্ন ওঠে। বার্সেলোনা নানা চেষ্টা করেও যেন দেম্বেলের শতভাগ পাচ্ছিল না। তবে লিওনেল মেসির পরামর্শে বদলে যেতে থাকেন তিনি।
দেম্বেলের ভাষায়, ‘যদি স্বপ্ন পূরণ করতে চাই তবে আরও সিরিয়াস হতে হবে। তখন থেকেই আমি তাকে (মেসিকে) পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি, তিনি সবসময় আমাকে সঠিক পরামর্শ দিতেন এবং বুঝতে পারতেন কোন সময়ে আমার কী প্রয়োজন।’ মেসির পরামর্শ আর ২০২১ সালে রিমা এদবুশকে বিয়ে করে দেম্বেলের ব্যক্তি জীবনেও পরিবর্তনের শুরু হয়। সন্তান জন্মের পর দেম্বেলে আরও পরিণত হন।
২০২৩ সালে মাত্র ৪৩.৫ মিলিয়ন ইউরোয় পিএসজিতে যোগ দেন দেম্বেলে। শুরুতে এমবাপ্পে গোলের চেয়ে অ্যাসিস্ট বেশি করতেন, কারণ কিলিয়ান এমবাপ্পে তখনো দলের মূল তারকা। কিন্তু এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার পরই শুরু হয় দেম্বেলের পুনর্জন্ম। কোচ লুইস এনরিকে তখন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন, ‘আমরা চাই তুমি আরও গোল করো, আরও স্বার্থপর হও।’ তাতেই এলো সাফল্য। ফলস নাইন হিসেবে খেলতে গিয়ে তিনি পেলেন নতুন ভূমিকা আক্রমণ সাজানো, সুযোগ তৈরি আর গোল করার দায়িত্ব।
২০২৪-২৫ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেন ৩৫ গোল ও ১৪ অ্যাসিস্ট, মোট ৫১ গোলে সরাসরি অবদান। তার নেতৃত্বেই পিএসজি জেতে ফ্রেঞ্চ লিগ শিরোপা, কুপ দে ফ্রান্স, চ্যাম্পিয়নস লিগ। ট্রেবল জয়ের পর পিএসজি ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালেও খেলে। এখন দেম্বেলে কেবল একজন ফুটবলার নন, বরং সংগ্রাম, পরিবার, ঐতিহ্য আর অধ্যবসায়ের প্রতীক।
