জুলাই আন্দোলনে অংশ না নিয়েও জুলাই যোদ্ধা!

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:১২ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করেও জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন এনায়েত উল্যাহ বাপ্পী (২৬) নামে এক কাঠমিস্ত্রি। নিজেকে জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে সরকারি অফিস-আদালতে প্রভাব বিস্তার ও মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর এনায়েত উল্যাহ বাদী হয়ে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে মামলার আবেদন করেন। এতে হামলা ও মারধরের অভিযোগে তিন সাংবাদিকসহ ১০৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন এবং ১৮ সেপ্টেম্বর মামলার শুনানির দিন মামলাটি প্রত্যাহার করেন।

এনায়েত উল্যাহ বাপ্পী সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুজাপুর গ্রামের আনোয়ার আলী সারেং বাড়ির আহসান উল্যার ছেলে।

জানা যায়, ২০২৩ সালে ১৯ জুলাই ফেনী শহরের ইসলামপুর সড়কে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তখন পথচারী হিসেবে রাস্তা পারাপারের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন এনায়েত উল্যাহ বাপ্পী। তৎকালীন সময়ে (১৯ জুলাই ২০২৩) প্রকাশিত স্থানীয় দৈনিক ফেনী সময় ও গফ. ইধঢ়ঢ়ু নামে তার নিজ ফেসবুক আইডিতে প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর নিজেকে আন্দোলনের আহত দাবি করে এক ছাত্রদল নেতার সহায়তায় ফেনী সিভিল সার্জন অফিসে গিয়ে আহতের তালিকায় নিজের নাম লেখান। সরকার পতনের আন্দোলনে অংশগ্রহণের দাবি করে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়ে যান তিনি। এমন ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গেজেট নম্বর ৪২৫, তারিখ : ২৭-০২-২০২৫। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ৩০টি গুলির স্পিøন্টার লাগার পরও ফেনীতে চিকিৎসা না নিয়ে ঘটনার ১০ দিন পর ঢাকায় চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানান। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ সাংবাদিকদের দেখাতে পারেননি।

আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এনায়েত উল্যাহ বাপ্পীর গায়েহলুদ ছিল এবং ৫ আগস্ট একই ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের ডিপটি বাড়ির আবদুল হকের মেয়ে উম্মে কুলসুম তারিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যা ছিল তার দ্বিতীয় বিয়ে।

এখন প্রশ্ন গায়েহলুদ ও বিয়ের দিন তিনি কীভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন? আর যদি সত্যি আহত হয়ে থাকেন, তাহলে ৫ আগস্ট কীভাবে বিয়ে করেন? আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুজাপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার বেলায়েত হোসেন বেলু বলেন, একসময় কাঠমিস্ত্রি কাজ করে সংসার চালানো বাপ্পী এখন লাখ লাখ টাকার মালিক। এখন আর কাজ করেন না। অথচ তারই ছোট ভাই হৃদয় ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি ও গত ৮ মে আওয়ামী লীগের ফেনীতে ঝটিকা মিছিলের নেতৃত্ব দেন।

ফেনীর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, গত বছরের ৪ আগস্ট মহিপালে ছাত্র আন্দোলনে আহত দাবি করে অনেকে মামলা করার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আসামিদের নামের তালিকা প্রকাশ করেন এবং তাদের পরিবারের কাছে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্য করা।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, ‘ফেনীতে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ নিরপরাধ লোকদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফুলগাজীর কিছু ছেলে আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে মামলা-বাণিজ্য করছে। আমরা এ ব্যাপারে সবসময় প্রতিবাদ জানিয়েছি।’

জুলাই আন্দোলনে অংশ না নিয়েও কীভাবে জুলাই যোদ্ধা হলেন এমন প্রশ্নের জবাবে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, ‘আন্দোলনের পর তৎকালীন সিভিল সার্জন তার শরীরের আঘাতের চিহ্ন দেখে হয়তো তালিকাভুক্ত করেছেন। বিষয়টি আমি জানিনি।’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল সার্জন অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্দোলনের পরপর ছাত্রদলের এক নেতার মাধ্যমে নিজেকে আহত দাবি করে জোরপূর্বক তালিকায় নাম তুলেছেন। এ সময় তিনি শরীরের আঘাতের চিহ্ন ও ছবি দিয়েছেন। তবে তা কবের, তা যাচাই করা হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে এনায়েত উল্যাহকে একাধিকবার মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি ধরেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত