‘আল্লাহ, তোমার অসীম কুদরত দিয়ে আমাদের রক্ষা করো, ভাঙন থামাও। এখন বাড়ি নদীতে চলে গেলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে মরব!’ পদ্মার তীরে বসে সকাল-বিকেল এমন প্রার্থনা করছেন আশি বছর বয়সি চান্দু মিস্ত্রি। গত বৃহস্পতিবার সকালে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পদ্মার তীরে গিয়ে দেখা গেল, চান্দু মিস্ত্রি দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে এভাবেই ফরিয়াদ করছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ‘নদীতে পাঁচবার আমার বাড়ি ভেঙেছে। নিজের জমি নেই, বাপ-দাদার ভিটেও নদীতে চলে গেছে। এখন অন্যের জমিতে ঘর তুলে বাস করছি। এবারও যদি নদী বাড়ি ভাঙে, শেষ বয়সে কোথায় যাব, কী খাব?’ শুধু চান্দু মিস্ত্রি নন, পদ্মার তীরের হাজারো মানুষের এখন এমনই আহাজারি। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে পুরো নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
পদ্মা নদী দ্বারা বেষ্টিত নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন যেন দুই ভাগে বিভক্ত। ফরিদপুর সদরের সংলগ্ন এ ইউনিয়নের একাংশ পদ্মার এপারে, আরেকাংশ মানিকগঞ্জের কাছে অবস্থিত। মাঝখানে রয়েছে বিশাল পদ্মা। ফলে উভয় তীরেই চলছে নিরবচ্ছিন্ন ভাঙন। অতীতে পদ্মার আগ্রাসী ভাঙনে বিলীন হয়েছে বহু গ্রাম। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে ইমাম আলীর ডাঙী, জলিল সরদারের ডাঙী, আহমদ বেপারীর ডাঙী, শুকুর আলীর ডাঙী এবং ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙী গ্রাম। নদী গ্রাস করেছে চারটি বাজার ও একটি হাট।
এছাড়া, কয়েকশ কবরস্থান এবং কয়েক কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইনও নদীগর্ভে চলে গেছে। প্রতিবছর পানি বাড়ার সময় এবং কমতে শুরু করলে নদীভাঙন তীব্র হয়। গত কয়েকদিন পদ্মার পানি বাড়ায় ইউনিয়নের এপারের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড এবং ওপারের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে নদীভাঙনের কারণে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, বেশ কিছু বসতবাড়ি এবং বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়েছে। বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে তিনটি হাইস্কুল, কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারটি আশ্রয় কেন্দ্র, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক, দুটি বড় সেতু, ১২টি কাঁচাপাকা রাস্তা, ২০টি মসজিদ, দুটি মাদ্রাসা, পাঁচটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল, একটি আদর্শ গ্রাম, একটি গুচ্ছগ্রাম, বেশ কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, একটি ইটভাটা, গবাদি পশুর জন্য নির্মিত দুটি মাটির কেল্লা এবং পাঁচ শতাধিক বসতবাড়িসহ বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি।
৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নান্নু চৌধুরী, সরোয়ার হোসেন, মোস্তফা হোসেন, হাসেম মিস্ত্রিসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র পদ্মা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এই অবাধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে, ফলে এ বছর ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, কয়েকদিন পর পানি কমতে শুরু করলে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
পদ্মার তীরে নির্ঘুম রাত কাটানো এই মানুষদের একটাই আকুতি দ্রুত স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ না করা গেলে হাজারো মানুষ তাদের বসতবাড়ি ও জমি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হবে।
নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে নর্থচ্যানেল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই ইউনিয়ন আর থাকবে না।’
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, ‘ভাঙনের বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকাতে বালুর বস্তা ফেলা হবে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠানো হবে।’
