জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপো গ্রান্ডি, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ ও ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেলের সঙ্গে সোমবার পৃথক বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
বৈঠকে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য মানবিক কার্যক্রমে তীব্র অর্থ সংকটের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। তহবিল হ্রাসের ফলে শরণার্থী শিশুদের শিক্ষাসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
এছাড়াও তাদের আলোচনায় ছিল রোহিঙ্গা সংকটের বিস্তৃত চিত্র, রাখাইনের পরিস্থিতি, মিয়ানমার শরণার্থীদের সহায়তায় ভয়াবহ তহবিল ঘাটতি এবং শীর্ষ সম্মেলনে আলোচ্য মূল বিষয়সমূহ। শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে তিনি সংকটের মূল দিকগুলো নিয়েও গভীর আলোচনা করেন।
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস জানান, গত ১৮ মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে মঙ্গলবারের ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন—যা প্রথমবারের মতো একান্তভাবে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হচ্ছে—একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেবে। এই আয়োজন আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য জরুরি তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করবে বলে ড. ইউনূস আশা ব্যক্ত করেন।
গত মাসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনের, যেখানে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতারা চার দিনের আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেটির প্রশংসা করেন গ্রান্ডি। তিনি বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানান, বিশেষত বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে, যাতে সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো টেকসই সমাধান নেই। এর বিকল্প কিছু নেই। আশা করি আগামীকালের সম্মেলনে কার্যকর কিছু প্রস্তাব আসবে। এ বিষয়টি বিশ্ব ভুলে যাওয়ার মতো নয়।’
জুলি বিশপ রোহিঙ্গাদের সহায়তায় তহবিল উৎস বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অবদান বাড়ানোর আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গাদের শিক্ষা সংকট নিয়ে প্রফেসর ইউনূস বলেন, এই অর্থ সংকট ইতোমধ্যেই বহু স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে এবং হাজারো রোহিঙ্গা শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। এটি এক বিপর্যয়। ক্যাম্পে শিক্ষা ব্যবস্থা লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছিল। এখন এই শিশুরা ক্রোধে বেড়ে উঠছে। আর সে ক্রোধ অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে।
ইউনিসেফ প্রধান রাসেল বৈশ্বিক তহবিল পরিস্থিতির করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে সহায়তাদানকারী ইউরোপের দেশগুলোও এখন ইউনিসেফসহ মানবিক সংস্থাগুলোর অবদান কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গা তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ চালু করার আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যতে নিজ দেশে ফিরে গেলে তারা সেই দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে।
বৈঠকে ইউনিসেফের উপনির্বাহী পরিচালক টেড চাইবান বলেন, ‘কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
বৈঠকে আগামী মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের রোহিঙ্গা সম্মেলন সম্পর্কেও আলোচনা হয়। প্রফেসর ইউনূস ইউনিসেফকে সম্মেলনে ক্যাম্পে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও প্রসারের পক্ষে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
একটি বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চলছে এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে যাচাই করা হয়েছে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, এনসিপি নেতা তাসনিম জারা এবং এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।
