বারবার সীমা লঙ্ঘন পরিণতিকে ত্বরান্বিত করে

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৪০ এএম

মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলো তৈরি হয়েছে অন্যায়, নির্যাতন ও সীমা লঙ্ঘনের কারণে। যুগে যুগে একশ্রেণির ক্ষমতাশালী বর্বর গোষ্ঠী দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়েছে, পৃথিবীর বুক রক্তে রঞ্জিত করেছে। তারা সীমা লঙ্ঘনের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমা লঙ্ঘনকারীরা কখনো টিকতে পারে না। বরং তাদের অন্যায়ই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অত্যাচার, নির্যাতন, বর্বরতা, এসবের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসলাম বলে, মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমান। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে বা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ ছড়ানোর কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা মায়েদা ৩২) ইসলাম মানুষের জীবন, সম্মান ও সম্পদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত বলে ঘোষণা করেছে। তাই এ আমানতের অবমাননা করা, নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেওয়া বা হত্যার পথ বেছে নেওয়া মহাপাপ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের শেষ ভাষণে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান আজকের এ দিনটির মতোই পবিত্র।’ (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ মানুষের জীবনকে যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি তার সম্পদ ও সম্মানকেও অব্যাহতভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। এ নির্দেশ কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং গোটা মানবতার জন্যই প্রযোজ্য। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু শক্তিশালী জাতি ও শাসক সীমা লঙ্ঘনের কারণে ধ্বংস হয়েছে। কোরআনে অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কাহিনি বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সে বনি ইসরাইলের শিশুদের হত্যা করত, মানুষকে দাসে পরিণত করত। তখন মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.)-কে পাঠান মুক্তির দূত হিসেবে। কিন্তু ফেরাউন সীমা লঙ্ঘনেই অটল থাকে। এক সময় মহান আল্লাহ তাকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে দেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো। নিশ্চয় অনেক মানুষ আমার নিদর্শনগুলোর ব্যাপারে গাফেল।’ (সুরা ইউনুস ৯২)

একইভাবে আদ ও সামুদ জাতি নিজেদের শক্তি ও ঐশ্বর্যের গর্বে সীমা লঙ্ঘনে লিপ্ত হয়েছিল। তারা আল্লাহর রাসুলদের অস্বীকার করে অন্যায়কে জীবনাচরণের নিয়ম বানিয়েছিল। এর ফলেই তাদের ওপর নেমে আসে আল্লাহর গজব। প্রবল ঝড় আর ভয়াবহ বজ্রধ্বনি তাদের ধ্বংস করে দেয়। ইতিহাসে আজও তাদের নিদর্শন পড়ে আছে, মানুষের শিক্ষা নেওয়ার জন্য। এবার যদি গাজার দিকে তাকাই, টানা দুই বছর ধরে সেখানে ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছে। প্রতিদিন বোমা পড়ছে ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রে। নারী-শিশু নির্বিচারে নিহত হচ্ছে। একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার প্রশাসন এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে প্রকাশ্য দম্ভ নিয়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা তাদের উৎসাহ জোগাচ্ছে আরও সীমা লঙ্ঘনে। কিন্তু ইতিহাসের পাঠ বলে, জুলুমের এ পথ অবশেষে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবে। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে কোরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, তারা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ ছড়াচ্ছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যখন তাদের বলা হয় পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো সংশোধনকারী।’ জেনে রাখো, তারাই ফ্যাসাদকারী, কিন্তু তারা উপলব্ধি করে না।’ (সুরা বাকারা ১১-১২) ইসরায়েলও আজ নিজেদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের কথা বলে মানুষ হত্যা করছে। আসলে তারা পৃথিবীতে ফ্যাসাদকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করছে না। আধুনিক ইতিহাসেও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সীমা লঙ্ঘনের কারণে খুব খারাপ পরিণতির শিকার হয়েছে। এর আগে রোমান সাম্রাজ্য একসময় ছিল পৃথিবীর আধিপত্যশালী শক্তি। কিন্তু অবিচার, ভোগবিলাস ও নির্যাতনের কারণে তাদের পতন ঘটে। ঠিক একইভাবে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতায় শীর্ষে থাকার পরও অনেক শাসক বিলাসিতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও জুলুমে লিপ্ত হওয়ার কারণে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি।

মানবসভ্যতার এ ধারাবাহিক শিক্ষা আমাদের সামনে স্পষ্ট। জুলুমের পরিণতি হলো পতন। ক্ষমতা দিয়ে অন্যায় টিকিয়ে রাখা যায় না। বরং ক্ষমতার অপব্যবহারই শক্তিশালীদের পতনের সিঁড়ি হয়ে দাঁড়ায়। ইসরায়েলের বর্তমান কর্মকাণ্ড সেই পুরনো ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। আজ তারা হয়তো আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির জোরে শক্তিশালী মনে করছে নিজেদের। কিন্তু মানুষের আর্তনাদ, শহীদদের রক্ত, অনাথদের কান্না একদিন তাদের ধ্বংসের কারণ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি বলেছেন, তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে যদি জালেম হয় কিংবা মজলুম হয়। সাহাবিরা বিস্মিত হয়ে বললেন, মজলুমকে সাহায্য করব, সেটা বুঝলাম। কিন্তু জালেমকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি উত্তরে বললেন, তাকে অন্যায় করা থেকে বিরত রেখে। (সহিহ বুখারি) এর মানে, অন্যায়কে সহ্য করা বা নীরব থাকা ইসলামসম্মত নয়। বরং অন্যায় থামাতে উদ্যোগী হতে হবে। ইসরায়েলের বর্তমান বর্বরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাই শুধু ফিলিস্তিনিদের দায়িত্ব নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্বমানবতার দায়িত্ব। নীরবতা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। নির্যাতিত মানুষকে সাহায্য না করা মানে অত্যাচারীর পক্ষে দাঁড়ানো। অত্যাচারীরা হয়তো মনে করে, তারা নিরাপদ। কিন্তু সত্য হলো, তাদের বারবার সীমা লঙ্ঘন তাদের শেষ পরিণতিকে দ্রুত টেনে আনছে। আর সীমা লঙ্ঘন কখনো স্থায়ী হয়নি। অত্যাচারীরা হয়তো ক্ষমতার জোরে কিছুদিন মানুষকে রুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু স্থায়ীভাবে টিকতে পারে না। গাজার রক্ত, কান্না ও ধ্বংসস্তূপ একদিন ইসরায়েল পতনের দলিল হয়ে দাঁড়াবে। আজকের প্রেক্ষাপটে তাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, বারবার সীমা লঙ্ঘন পরিণতিকে ত্বরান্বিত করে।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত