সরকারি জমি বেদখলে ‘রাষ্ট্রীয় মদদ’

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:০১ এএম

সরকারি জমির ওপর বদনজর পড়েছে সংঘবদ্ধ চক্রের। বলতে গেলে ‘রাষ্ট্রীয় মদদে’ই হাতছাড়া হচ্ছে একের পর এক সরকারি সম্পদ। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের হাজার কোটি টাকার জমি দখলবাজদের নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানায় চলে গেছে বলে জানা গেছে। ওই চক্রটির সঙ্গে গোপনে হাত মেলাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় নিযুক্ত দর্নীতিবাজ কিছু আমলা। এ লক্ষ্যে চক্রটি আদালতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে জাল ওয়ারিশ সনদ ও ভুয়া দলিল। ইতিমধ্যে বেহাত হয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদের হিলভিউ আবাসিক, হালিশহরের রামপুর ও নিউ মার্কেট এলাকার কয়েকশ কোটি টাকার সরকারি জমি। এবার বেহাত হতে যাচ্ছে নগরের লাভলেন এলাকার প্রায় ১৮ শতক আয়তনের ৩০ কোটি টাকার সরকারি জমি ও বাড়ি।

সরকারি সম্পদ রক্ষায় নতুন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। লাভলেনের সরকারি জমি বেহাত হতে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দখলবাজদের চোখ পড়েছে সরকারি সম্পদের ওপর। এ চক্রের অপতৎপরতা বন্ধে চট্টগ্রামের সব সরকারি জমির তথ্য (বিশেষ করে মালিকানা-সংক্রান্তে আদালতে বিচারাধীন) সংবলিত তালিকা একটি সফটওয়্যারে ঢোকানো হচ্ছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য তহবিল গঠন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত উকিল নিয়োগ করা হবে।’

চট্টগ্রাম নগরে একের পর এক সরকারি জমি বেহাত হওয়ার পেছনে সদ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি হওয়া চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের দুর্নীতি ও অনিয়মকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ফরিদা খানম তার আমলে কয়েকশ কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ‘ভূমি দস্যূদের’ হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ মেনে সবকিছু করা হয়েছে। অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।’

লাভলেনের সরকারি জমির নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, জমি ও বাড়িটির মালিক ছিলেন এক পাকিস্তানি দম্পতি। স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় তারা সপরিবারে চলে যান পাকিস্তান। কয়েক বছর আগে ওই সরকারি সম্পত্তির ওপর বদনজর পড়ে একটি চক্রের। চক্রটি কিছু ব্যক্তিকে জমির মালিক সাজিয়ে আইনি লড়াই করে তাদের পক্ষে উচ্চ আদালতের রায় অর্জন করতেও সক্ষম হয়েছে। অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় এ সম্পদের রক্ষায় নিয়োজিত চট্টগ্রামের গণপূর্তের রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা দখলবাজদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। ৫৩ বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করলেও বর্তমানে ওই জমি ও বাড়িটি প্রকৃতপক্ষে কার দখলে আছে, স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতু।

সম্প্রতি তার দপ্তরে গিয়ে সরকারি জমির কথিত মালিকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাইলে হকচকিয়ে যান সরকারি এই কর্মকর্তা। তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে জমি ও বাড়ি নিজেদের হেফাজতে রয়েছে বলে তিনি দাবি করলেও অনুসন্ধানে এ দাবির প্রমাণ পায়নি দেশ রূপান্তর।

সরেজমিন লাভলেনে গিয়ে দেখা গেছে, জমিটি ঘিরে আছে সীমানা প্রাচীর। জমির একাংশে জীর্ণদশার একতলা একটি পাকা বাড়ি। ঢোকার জন্য আছে একটি ফটক। যদিও সেটিতে তালা ঝুলছে। ফটকের ডানপাশে আছে একটি ফলক। কালো কালি দিয়ে ফলকটি মোছা, তবে লেখা পড়া যায়। ফলকে লেখা সরকারি ভূমি অফিস, বাকলিয়া সার্কেল।

সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় গিয়ে কিছুক্ষণ ওই ফটকের সামনে অবস্থান করেন এই প্রতিবেদক। বাড়িটিতে কালো পোশাক পরা এক নিরাপত্তাকর্মীকে ফটকের তালা খুলে ঢুকতে দেখা গেছে। নাম, কার হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন জানতে চাইলে পরিচয় না দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ জমি এতদিন সরকারের ছিল। এখন অন্যের।’

স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে ওই বাড়িতে বাকলিয়া ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলেছে। ফটকের ওপর ভূমি অফিসের একটি সাইনবোর্ডও ছিল। চার-পাঁচ মাস আগে সাইনবোর্ডটি উধাও হয়ে যায়। কারা সাইনবোর্ডটি নিয়ে গেছে জানাতে পারেননি গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতু।

সরকারি এ সম্পদ রক্ষায় গত ২০ মে স্বত্ব ঘোষণা ও দলিল বাতিলের জন্য চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল, ঢাকার পক্ষে বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছেন একই সংস্থার চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাহুল গুহ। মামলার সর্বশেষ তথ্য জানাতে রহস্যজনকভাবে অপারগতা প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম আদালতে নিয়োজিত সরকারি উকিল (জিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম। জানা গেছে, মামলায় ওই জমির কথিত মালিক মৃত ফারুক মিয়ার স্ত্রী শাহজদী বেগম ও তার ছেলে মো. মামুনুর রশিদ মিয়া, আসিফ মাহমুদ, মল্লিকা খাতুন, মো. মোশরারফ হোসাইন, ছাবেদা খাতুন, জাগিরা খাতুনকে বিবাদী করা হয়েছে।

মামলার আর্জিতে বলা হয় তফসিলে উল্লিখিত জমি ও ঘর জনৈকা সুফিয়া খাতুনের নামে লিজ নেওয়া। তার স্বামী নিজামুল হক। জমির একাংশে সুফিয়া দম্পতির মেসার্স প্যানেরমা নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। জনৈক পীযূষ কান্তি ঘোষ এটি পরিচালনা করতেন। সুফিয়া দম্পতির অধীনে মাসিক ১০০ টাকা ভাড়ায় পরিবারের ১৪ সদস্য নিয়ে পীযূষ কান্তি আট বছর সেখানে বসবাস করেছেন। সুফিয়া খাতুন ও নিজামুল হক খান পাকিস্তানি ছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে পাকিস্তান চলে যান নিজামুল হক খান। তিনি আর বাংলাদেশে ফিরে আসেননি।

তফসিলের জায়গা ও ঘর শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ‘ক’ তালিকাভুক্ত করে বাংলাদেশ সরকার। ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ১৯৭২ সালে জমি ও বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সরকার। ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল বাড়িটি পীযূষ কান্তি ঘোষকে বরাদ্দ দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। পরে বাড়িটি আমির হোসেন নামে গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তাকে বরাদ্দ দেয় পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড। আমির হোসেনের বরাদ্দ বাতিলের জন্য ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডে আবেদন করেন পীযূষ কান্তি।

আবেদন খারিজ হয়ে গেলে জেলা প্রশাসকের কাছে মিস আপিল করেন তিনি। সেটিও খারিজ হয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই গণপূর্তের রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ বাড়িটি দখল করে। কিন্তু পীযূষ কান্তি বাড়িটি ছেড়ে না দেওয়ায় বরাদ্দ গ্রহীতা গণপূর্তের আমির হোসেন খানকে দখল বুঝিয়ে দিতে পারেনি সরকার। এরপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাকে বাড়িটি বরাদ্দ দেয় পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড।

আর্জিতে বাদী বলেন, মামলার বিবাদীদের ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যু সনদ জাল। বিবাদী জাগিরা খাতুন, ফারুক মিয়া, আবেদা খাতুন পাকিস্তানি নাগরিক নন। ১৯৮১ সালের ২৭ নভেম্বর জনৈক এসএম নিজামউদ্দৌলার সঙ্গে ১ লাখ টাকার বায়নানামা চুক্তিটিও জাল। বিবাদীদের ১৯৩৬ সালের ৩৬৬১ অংশনামা এবং ১৯৩৭ সালের ৩৪২৫ দলিল, ১৯৭৭ সালের ১৪৫৫৯ অংশনামা বা ১৫২১০ সংশোধিত অংশনামা দলিলও জাল। রাষ্ট্রপতির ১৬/৭২-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী দাখিলকৃত দলিলটি বেআইনি ও অকার্যকর। সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য দলিলাদি তৈরি করেছেন বিবাদীরা। বিবাদী জাগিরা খাতুন ও ছাবেদা খাতুনের ওয়ারিশ সনদ এবং ফারুক মিয়ার জাতীয়তার সনদও জাল।

মামলার আর্জিতে বলা হয় আদালতে বিবাদীদের মৃত্যু ও ওয়ারিশ সনদ জাল বলার পরও সত্যতা যাচাই না করে বাদীর বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করা হলেও ২০২২ সালের ৭ নভেম্বর দুটি আপিলই খারিজ হয়ে যায়। খারিজের বিরুদ্ধে বাদী সিভিল রিভিউ পিটিশন করলেও ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর তা খারিজ হয়ে যায়।

আরও বলা হয়, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পরও বিবাদীদের দাখিল করা দলিল জাল কি না, তফসিলোক্ত জমিতে বিবাদীদের বসতঘর ভোগদখলে ছিল কি না, তাদের মালিকানা ছিল কি না, সরকারি সম্পত্তি দখলের জন্যই দলিল তৈরি করা হয়েছে কি না, তা বিচার-বিশ্লেষণ না করায় বাদীর স্বত্বে কালি লেগেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত