বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যৌতুক একটি পুরনো সামাজিক ব্যাধি। আইনের চোখে এটি দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সমাজে এখনো এর রূপ পাল্টে টিকে আছে। সরাসরি যৌতুক দাবি করলে সামাজিক চাপ কিংবা আইনি ঝুঁকিতে পড়তে হয়, তাই অনেক পরিবার একে উপহার বা আনুষ্ঠানিক উপহার বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। যৌতুক আমাদের সমাজে মারাত্মক ব্যাধি যা থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন। সভ্যতার আদি থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়ার প্রথা বন্ধ করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এখন যৌতুক প্রথা বিলুপ্ত না হয়ে নতুনরূপে ফিরে এসেছে। বর্তমানে যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া আইনগত অপরাধ। এখন ‘যৌতুক’ শব্দের পরিবর্তন হয়েছে ‘উপহার’ শব্দের মাধ্যমে। বর্তমানে বিবাহের ক্ষেত্রে যৌতুক শব্দের ব্যবহার না করে কনেপক্ষ বরপক্ষকে খুশি হয়ে, নানা সামগ্রী প্রদান করে। যা জোগাড় করতে গিয়ে কনেপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। বরপক্ষ এই লেনদেনকে যৌতুক হিসেবে চিহ্নিত না করে কনেপক্ষ থেকে দেওয়া উপহার হিসেবে চিহ্নিত করে। লোকলজ্জার ভয়ে, কনেপক্ষ উপহার নামের আড়ালে যৌতুক দিতে বাধ্য হয় এবং বরপক্ষ তা উপহার হিসেবে সাদরে গ্রহণ করে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর শত শত নারী যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, সে বছর অন্তত ৩,০০০-এর বেশি নারী যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। গ্রামীণ অঞ্চলে এ প্রবণতা বেশি হলেও শহরেও যৌতুকের চাপ পরিবারকে ধ্বংস করছে। যার আইনগতভাবে কোনো কঠিন শাস্তি নেই। এই সামাজিক ব্যাধি যে দিন দিন মারাত্মক রূপ ধারণ করছে, সে সম্পর্কে কারও ধারণা নেই। বর্তমানে উপহার নামক যৌতুক নেওয়ার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সামাজিক চাপ ও প্রথাগত বিশ্বাস। দীর্ঘদিনের প্রথা হিসেবে অনেকেই মনে করেন, বিয়েতে মেয়ের পরিবারকে কিছু দিতে হবে। সমাজে এই মানসিকতা এখনো রয়েছে। যৌতুকবিরোধী আইন থাকলেও, উপহারের নামে দেওয়া-নেওয়া প্রমাণ করা কঠিন। ফলে অনেকেই আইন এড়াতে এ কৌশল নেয়। অর্থনৈতিক অসাম্য সৃষ্টির ফলে, ছেলে পক্ষকে উচ্চতর ভাবা হয়। তাই মেয়ে পক্ষ উপহার দিয়ে সম্মান রক্ষা করে বলে মনে করে।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হওয়া যৌতুকের অন্যতম প্রধান কারণ। শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়লেও মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। এর প্রভাব কমিয়ে আনতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন : সবার সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবার ও সমাজে বোঝাতে হবে যে, উপহার দিয়ে আসলে যৌতুককেই বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। বিয়েতে দেওয়া-নেওয়া সম্পদের সঠিক হিসাব ও নজরদারি করতে হবে। প্রয়োজনে শাস্তি বাড়াতে হবে। সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া পরিবারকে বর্জন করতে হবে। যে পরিবার যৌতুক নেয় বা দেয়, তাদের সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষা ও মূল্যবোধ চর্চা করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে যৌতুককে লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখতে শেখাতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে যৌতুক প্রথার নিরসন হওয়া দরকার। সরকারের উচিত, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতি উপজেলায় একটি করে কমিটি গঠন করা যাদের কাজ হবে, সরাসরি যৌতুক কিংবা উপহার নামের পেছনে লুকানো যৌতুক প্রথাকে মূল থেকে ধ্বংস করা। সরকারের পাশাপাশি জনগণের ভূমিকাও থাকতে হবে। কেননা এই রাষ্ট্র আমাদের এবং এর উন্নয়নের জন্য সব কার্যকর পদক্ষেপে অংশগ্রহণ করার দায়িত্বও আমাদের। যৌতুক প্রথার বিলুপ্তিকরণে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে না এগোতে পারি, তবে তা ভয়ানক এবং ক্ষতিকর রূপ ধারণ করবে।
আমাদের মূল সমস্যা হলো, মানসিকতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। পরিবারগুলো মনে করে, বিয়েতে কিছু দেওয়া সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অংশ, আবার অনেকে সরাসরি দাবি করলেও উপহার বলে চালিয়ে দেয়। এতে আইনকেও এড়ানো যায়, সমাজেও সম্মান অক্ষুন্ন থাকে। কিন্তু আসলে এটি এক ধরনের প্রতারণা। কারণ স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার আর জোরপূর্বক নেওয়া জিনিস এক নয়। যদিও যৌতুককে বর্তমানে উপহার সামগ্রীর নাম দেওয়া হয়েছে তবুও এই উপহারের জোগান দিতে কনেপক্ষকে মাশুল দিতে হয়। একজন মেয়ের পিতা তার সমগ্র জীবনের সঞ্চয় করা অর্থ কন্যার বিয়েতে উপহার দিতে ব্যয় করেন। ফলে তাকে সর্বহারা হতে হয়। শুধু তাই নয়, এই উপহার লেনদেনের প্রক্রিয়া চলে দীর্ঘসময়। এর সমাধান এককভাবে কোনো দিন সম্ভব নয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, সরকার এবং গণমানুষকে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। না হলে আমাদের সমাজের গণমানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার হবে বিশ্বের কাছে। তখন আমরা চিহ্নিত হতে পারি, আদি সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে। এই অসম্মানজনক পরিচয় থেকে উদ্ধার পেতে হলে, সচেতন হওয়ার সময় এখনই। কোনোভাবেই বিষয়টি যেন ভুলে না যাই। না হলে, ভয়াবহ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তখন কিছুই করার থাকবে না। সামাজিক ব্যাধি দূর করার, মূল দায়িত্ব কার এটি না বলাই ভালো।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
