নদী সাগর পাহাড় রেখেই মাস্টারপ্ল্যান

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ০২:০৬ এএম

ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সাগর পাড়ের বিশাল এলাকাটি একসময় সবুজায়ন ছিল। এখন এই বিস্তীর্ণ এলাকায় ট্রাক ডিপো, কনটেইনার ডিপো কিংবা যত্রতত্র লোহা-লক্কড়ের স্থাপনা গড়ে উঠছে। কিন্তু সাগর পাড়ের বিশাল এলাকায় বিশে^র অন্যান্য শহরে যেখানে বহুতল ভবন গড়ে তোলার মাধ্যমে পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে আমরা পেছনের কাতারে।

শুধু কি সাগর পাড়? পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বহুতল ভবনের অনুমোদন নেই। ফলে চট্টগ্রাম পতেঙ্গা স্টিলমিলস বাজারের সাগর পাড়ের খেজুরতলা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পুরো এলাকায় অসংখ্য আবাসিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব আবাসিক স্থাপনার একটিও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) থেকে অনুমোদন পায়নি। এ এলাকার ভূমি কৃষি ও কমিউনিটি ফ্যাসিলিটি হিসেবে মার্ক করা আছে। সাগর পাড়ের এই এলাকাটি কি কৃষিজমির জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া সঠিক পরিকল্পনার অংশ?

নগরীর পাহাড়গুলোতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেই। এই ধারা মানতে গিয়ে একটি চক্র দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পাহাড় কেটে সমতল করছে। আর সেই সমতলে আবার সিডিএ ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ায় কিন্তু ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকার চশমা হিল, রহমাননগর, কসমোপলিটন, হিলভিউ আবাসিক এলাকা, মোজাফফর নগর, দক্ষিণ খুলশী, নাসিরাবাদ প্রপার্টিজ, পাহাড়িকা আবাসিক এলাকায়, কুঞ্জছায়া, পশ্চিম খুলশী আবাসিক এলাকা, কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকাসহ এ নগরের বেশিরভাগ আবাসিক এলাকা পাহাড় কাটা ভূমিতে গড়ে উঠেছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, পরিকল্পনার ব্যর্থতায় কি সাবার হয়েছে পাহাড়?

শুধু পাহাড়, নদী ও সমুদ্রতীর নয়, এই নগরের পুকুর ও জলাশয়গুলোও ভরাট হচ্ছে ভুল পরিকল্পনার কারণে। একসময়ের বড় দীঘি ও পুকুরগুলো পর্যায়ক্রমে ভরাট করে পরিত্যক্ত পুকুরে পরিণত করা হয় এবং একসময় তা ভরাট হয়ে যায়। আর সেই ভরাট করা জায়গায় গড়ে উঠছে পরবর্তী সময়ে বহুতল ভবন। তাহলে এর দায় কার?

বাকলিয়ার বগার বিল এলাকা ছিল প্রাকৃতিক জলাধার। এই এলাকায় ব্যাপক হারে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। ফলে পুরো বাকলিয়ায় এখন জোয়ারের পানি জমে যায় এবং বৃষ্টির পানি সহজে কর্ণফুলীতে নেমে যায় না। সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানে নর্দান হিল (উত্তরের পাহাড়) নামে টাইগারপাস থেকে উত্তর দিকে ফয়’স লেক পার হয়ে আরও উত্তর দিকের বিশাল পাহাড়গুলো সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এসব এলাকার পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা।

নগর জুড়ে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কোথাও পরিকল্পনায় ছিল এক ধরনের ভূমিব্যবহার, বাস্তবে হচ্ছে অন্য ধরনের। এমন উন্নয়নের কারণে নগর জুড়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়ছে এবং বাড়ছে নগর দুর্ভোগ। এ বিষয়ে নগর-বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর নজরুল ইসলাম সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিবেশকে অগ্রাহ্য করে কোনো উন্নয়ন বাস্তবসম্মত হয় না। চট্টগ্রামের চট্টগ্রামের আজকের পরিণতির জন্যও অপরিকল্পিত উন্নয়ন দায়ী। আর পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে প্ল্যানিং বডি থাকতে হবে। সিডিএ সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবেশ ও পরিকল্পনার নলেজ রয়েছে সেই ব্যাকগ্রাউন্ডের জনবল লাগবে।

২০৫০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টারপ্ল্যানের প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের জুনে। ৩৩ কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার টাকার এই মাস্টারপ্ল্যান প্রায় শেষপর্যায়ে। এর আগে ১৯৯৫-১৫ সালের ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ১৯৯৯ সালে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত