প্রবাসীদের অস্বাভাবিক মৃত্যু কেন?

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৪৩ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তারা দেশের জন্য অমূল্য বৈদেশিক মুদ্রা এনে জাতির অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখেন। গ্রামের ঘর থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত তাদের পাঠানো টাকার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এই অর্থ দেশের শিল্প খাত, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের জন্য এক প্রকারের ‘অদৃশ্য রক্তচাপ’ হিসেবে কাজ করে। প্রবাসীরা অনেক সময় নিজের স্বপ্নের জন্য নয়, পরিবারকে সাপোর্ট দিতে প্রতিদিন রোজকার ক্লান্তি, শারীরিক যন্ত্রণা এবং মানসিক চাপ সহ্য করেন। কিন্তু এই শ্রমিকদের জীবনের অন্তরালে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা অসীম পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা, অবহেলা এবং শেষ পর্যন্ত অনেকের জন্য একটি নীরব মৃত্যু। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭২৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন লাশ হয়ে। এ সংখ্যা কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিটি পরিবারের কান্না, প্রতিটি ভাঙা স্বপ্ন এবং আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার নিঃশব্দ সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক লাভের জন্য মানুষের জীবন কখনোই একটি পরিসংখ্যান মাত্র হতে পারে না। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মরত আছেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে গেছেন কাজের উদ্দেশ্যে। শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে গেছেন, যেখানে ২০২৩ সালে এই সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ অন্তত ৬ মাসের জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন বা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর বাইরেও অনেকেই আছেন যারা অবৈধভাবে বা ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় কাজ করছেন। তাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন, তবে অনুপাতিকভাবে দেখা যায়, এই অসুরক্ষিত শ্রমিকদের সংখ্যা কম নয়। এরা প্রায়শই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং শ্রমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ৭২৪ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৫৬৫ জন হৃদরোগে, ৪৮ জন সড়ক দুর্ঘটনায়, ১৯ জন কর্মস্থল দুর্ঘটনায়, ৩২ জন আত্মহত্যা এবং ৬১ জন অন্যান্য কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল যদি পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, সুরক্ষা এবং মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা থাকত। অনেক সময় মৃত্যুকে ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বা ‘হঠাৎ অসুস্থতা’ হিসেবে রিপোর্ট করা হয়, যেখানে প্রকৃত কারণ দীর্ঘকালীন শ্রম, অব্যবস্থাপনা ও মানসিক চাপ। প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু কেবল পরিবারের জন্য শোকের কারণ নয়, এটি দেশের মানবসম্পদ ও অর্থনীতির জন্যও একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। গালফ অঞ্চলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকাংশই নির্মাণ, স্যানিটেশন, নিরাপত্তা বা ড্রাইভিংয়ের মতো কঠিন শারীরিক পরিশ্রম-নির্ভর কাজে নিয়োজিত। অনেক শ্রমিককে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়, যেখানে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। বিশ্রামের সময় সীমিত, নিরাপত্তা সরঞ্জাম অপ্রতুল এবং খাবার ও পানিগ্রহণের সুযোগও অনেক সময় সীমিত থাকে। ফলস্বরূপ ক্লান্তি, ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। তীব্র পরিশ্রমের এই চক্রে দেহ ভেঙে পড়ে এবং অনেকের মৃত্যু ঘটে কর্মস্থলেই।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ভাইটাল সাইনস পার্টনারশিপ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গালফ অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার প্রবাসী শ্রমিক মারা যান, যাদের অধিকাংশই দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নাগরিক। শ্রমিকদের খাবারের মান, বিশ্রামের সময় এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা তাদের স্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। খাদ্যাভ্যাসের দুর্বলতা, বিশ্রামের অভাব এবং পরিবেশগত চাপে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত ক্ষয় পায়। অনেক শ্রমিকের জীবনযাত্রা এমনকি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে দৈনিক জল গ্রহণও পর্যাপ্ত হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কেবল শারীরিক অসুস্থতা নয়, মানসিক ও সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়।  ঋণের বোঝা, সামাজিক চাপ এবং নিজের ব্যর্থতার বোধ মিলিয়ে অনেকেই বিষণœতায় আক্রান্ত হন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আত্মহত্যার সংখ্যা ৩২ হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এছাড়া অনেক শ্রমিক প্রবাসে এমন পরিবেশে কাজ করেন যেখানে বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীর সমর্থন নেই। একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক চাপ একসঙ্গে মিলিয়ে তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিকের কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই। তারা অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারেন না, উচ্চ ব্যয় বা আইনি জটিলতার কারণে। অনেকের পাসপোর্ট বা রেসিডেন্স কার্ড না থাকায় চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে ভয় পান। ফলে ছোট অসুখ বড় আকার নেয় এবং অনেক মৃত্যুই ঘটে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে। খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকেও বড় সমস্যা বিদ্যমান। অধিকাংশ প্রবাসী রান্না করা খাবার পান না, ফলে তারা ফাস্টফুড ও তেলচর্বিযুক্ত খাবারের ওপর নির্ভরশীল। ফলমূল, শাক-সবজি ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণের অভাব তাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। ধূমপান, মদ্যপান এবং অনিয়মিত ঘুম আরও সমস্যার সৃষ্টি করে। শরীর ও মানসিক উভয় দিকের স্বাস্থ্য সমস্যা একসঙ্গে শ্রমিকদের জীবনকে প্রায়শই ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এটি শুধু ব্যক্তির ক্ষতি নয়, পরিবারের ওপরও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলে। প্রবাসীর মৃত্যু মানে একটি পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, সন্তানের শিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাওয়া এবং স্ত্রী ও বাবা-মায়ের জীবনে অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে আসা। এটি শুধু একটি পরিবার নয়, বরং সমাজের আর্থ-সামাজিক ভারসাম্যে আঘাত হানে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের উৎপাদনশীলতা ও জনশক্তির গুণগত মানকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রবাসীদের সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করছে। প্রবাসীদের মৃত্যু ও অসুস্থতার হার কমাতে হলে, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক নীতি জোরদার করা জরুরি। বিদেশে কর্মরত প্রতিটি শ্রমিকের জন্য ৬ মাস অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দূতাবাসগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র ও হেল্পলাইন স্থাপন করতে হবে, যাতে প্রবাসীরা গোপনে পরামর্শ ও সহায়তা নিতে পারেন। অভিবাসনের আগে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে স্বাস্থ্য সচেতনতা, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ সম্পর্কে বাধ্যতামূলক শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি, অবৈধ অভিবাসন রোধে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। অভিবাসন কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, এটি একটি মানবিক প্রক্রিয়া। যারা বিদেশে পরিশ্রম করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠান, দেশে ফিরে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তারা দেশের জন্য যা করেন, তা কোনো সরকারি প্রকল্প বা শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে একা সম্ভব নয়।

সময় এসেছে, প্রবাসীদের জীবন ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তারা শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা নন, তারা বাংলাদেশের প্রকৃত সম্পদ। প্রতিদিন হাজারো প্রবাসী দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসে অমানবিক পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অথচ তাদের জীবনের অবসান ঘটে যখন নিঃশব্দে, তখন দেশে ফিরতে হয় বাক্সে বন্দি লাশ হয়ে। এ যেন এক নীরব ট্র্যাজেডি। বাস্তবতা হলো, কোনো প্রবাসীর মৃত্যু হলে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটাই হয়ে দাঁড়ায় আরেকটি যুদ্ধ। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তা অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, অস্পষ্ট নির্দেশনা এবং দুর্ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে। সংকটে প্রয়োজন প্রশাসনিক সদিচ্ছা, বিমানবন্দরে স্পেশাল হেল্পডেস্ক এবং আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা। নইলে ‘প্রবাস থেকে ফিরছে শুধু লাশ’ এই নির্মম সত্যই হয়ে উঠবে প্রবাসী শ্রমিক জীবনের স্থায়ী শিরোনাম। প্রবাসে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষদের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই ধারাবাহিকতায়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (ডঊডই) কর্র্তৃক বৈধভাবে বিদেশগামী মৃত কর্মীদের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। এই অনুদান মৃত কর্মীর পরিবারকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিচ্ছে, বিশেষত যখন তারা উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানসিক ও আর্থিক সংকটে ভুগছেন। অনুদানের আওতায় শুধু প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী কর্মীরাই নন, যারা ছুটিতে দেশে ফিরে এসে মৃত্যুবরণ করেছেন তারাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা প্রমাণ করে সরকার কর্মীদের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। তবে, প্রবাসীরা মনে করছেন এই অনুদান যথেষ্ট নয়। অনেক সময় অর্থ পেতে দেরি হয় এবং সহায়তার পরিমাণও তাদের বাস্তব চাহিদার তুলনায় কম। অনেকে অনুরোধ করেছেন, মৃত প্রবাসীর পরিবারকে এককালীন ৩ লাখ টাকার পাশাপাশি তাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত ভাতা বা বীমা সুবিধা চালু করার।  প্রবাসীদের অর্থেই দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ টিকে আছে। তাই এই মানুষরা যাতে দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি নিজেদের পরিবারকেও নিরাপদ রাখতে পারেন, সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার। 

লেখক: সভাপতি, প্রবাসী সাংবাদিক সমিতি

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত