শামীম কবীরের নাম আমার প্রথম জানা, তার বন্ধু রায়হান রাইনের প্রথম গল্পবই ‘আকাশের কৃপাপ্রার্থী তরু’-র
উৎসর্গপত্র পড়ে। ২০০৪ সালে প্রকাশ পাওয়া সে বইয়ের
উৎসর্গ-এলাকায় লেখা ছিল
‘শামীম কবীর,
অন্যতর জীবন চেয়েছিল মসলা-ঘরে,
চায়ের বাক্সের ভেতর
কিংবা কোথাও
রাজহংস শিকারের জলে’।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্থর এক দুপুরে চা খেতে খেতেই আমার ঔৎসুক্যের জবাবে শামীম কবীরকে মেলে ধরেছিলেন রায়হান রাইন। আমি পঁচিশ না-পেরুনো একটা জীবনাস্ত যাওয়া কবিযুবার সন্ধানে থাকি তারপর থেকে।
হ্যাঁ, একদিন পেয়েও যাই। ১৯৯৭ সালে ‘দ্রষ্টব্য’ প্রকাশিত ‘শামীম কবীর সমগ্র’-দেখা দেয় ২০০৭-এর এক নীলক্ষেতি বিকেলে; এখন আমার সংগ্রহ থেকে বইটির পৃষ্ঠা ওল্টাতেই পাই আমার লেখা, চৌদ্দ বছর আগে আমারই শামীম-সেলিব্রেশন
‘শামীম কবীর,
বহুদিন সাধ ছিল
সমগ্র আপনাকে
নিজের করে পাব।
আজ নীলক্ষেত থেকে
২০ টাকায় যখন বইটি কিনি
তখন আমার পকেটে আর কিছুই নেই।
আপনার ১২তম মৃত্যুদিবসের কিছুটা আগে
এ হয়তো এক ধরনের উদযাপন’।
(পিয়াস মজিদ, ২৬. ০৯.০৭)
শামীম কবীরের সঙ্গে আমার যাত্রা শুরু হয়। ‘চব্বিশ’, ‘রোগশয্যার আলোবাদ্য’, ‘মনে হচ্ছে যাচ্ছে রেল’, ‘কোথায় দেবো রাজস্ব’-এইমতো কবিতা-পাণ্ডুলিপি আর গদ্য, ডায়েরি, চিত্রকলার গুচ্ছ তাকে নিবিড় করে রাখে, আমার কাছে। শামীম কবীর পাঠানুভূতি কেবল অপ্রকাশের ভার তৈরি করে। ভাবি, কবিতার-শিল্পের এই অচেনা আভা নিয়ে কেমনে ঘুমিয়ে আছেন তিনি, স্বেচ্ছারচিত সমাধির সীমানায়? আমাকে তাড়িয়ে ফেরেন শামীম কবীর । হঠাৎ দেখা হয় নভেরা হোসেনের সঙ্গে। ‘নভেরা’ নামে একটা কবিতায় পড়া তো ছিল এমন শামীম
‘জানানো আমার মনে কতো কথা পড়ে আর ঝড়ে উড়ে যায়/
মনোনিবেশিক হাওয়া ব্যগ্র হ’লে ঝড় হয় তবে।’
নভেরা’পা বলেন আমাকে কবি শামীমের জীবনের মৃত্যুপ্রিয় গল্প। তার ইতস্তত পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয়। ‘নির্বাচিত কবিতা’ নামে একটা বই-ও দাঁড় করাই আমরা, প্রকাশ পায় ২০২০-এ।
তবু শামীম কবীরের সঙ্গে দেখাই যেন শুরু হতে চায় না।
হঠাৎ এক ঈদের ছুটিতে, কুমিল্লা থেকে ঢাকা হয়ে বন্ধু আপেল মাহমুদের আতিথ্যে বগুড়া চলে যাই। বিস্মিত বন্ধুকে বলি, মহাস্থানগড় দেখতে আসা। ভেতরের বাসনা, শামীম কবীরের সাক্ষাৎ প্রার্থনা। কিন্তু কবি কি দেখা দেবেন? নভেরা’পা ফোনে জানান তার ঠিকানা-সাকিন। ঈদ-পরবর্তী শান্ত শহরের ‘সবজে বিকেলে’ যাই তার বাড়িতে। স্তব্ধতা এত বছর পরের উৎসবের মৌসুমকেও যেন ঘিরে ধরে আছে। সঙ্গী হয়ে এসেছিলেন শামীমের এক বন্ধু; ফিসফিস কণ্ঠ শুনি কানের কাছে ‘ওই ঘরটাতেই তো মনে হয়, ২ অক্টোবর ১৯৯৫-তে শামীম বেছে নেয় মরণের মধুকে।’
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। বগুড়ার কবরগাহে। ঢুকতেই সম্ভাষণ করেন যেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তিনিও চির-শুয়ে আছেন এখানেই। আচ্ছা, এই সমাধিবিতানে শামীম কবীরকে খুঁজতে এসে, ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর ওসমানকে মনে পড়ছিল কেন আমার! চিলেকোঠার অন্ধকার ছেড়ে নেমে এসো নিচে ওসমান ওরফে রঞ্জু, শূন্যের শাহেনশাহ হও আজ। আমি ইলিয়াসের অন্তিম বন্দর ছেড়ে ছুটি, আঁতিপাতি করে তল্লাশি চালাই। কোথায় আপনি শামীম কবীর সাহাব? নভেরা’পা বলে রেখেছিলেন, কবরটার অবস্থান চেনা যাবে কবরের কাছে খেজুর গাছের অবস্থিতি দেখে। প্রায় হঠাৎই বলা চলে, সন্ধ্যার সম্মোহনে গোরস্তান গোধূলিবর্ণ হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে পেলাম তাকে। মুহূর্তেই স্মরণে এলো মজনু শাহ :
‘শামীম কবীর, একদিন যে চেয়েছিল কেবল আয়না-ই তাকে গুড়িয়ে যেতে দেখুক; কুঁজো খেজুরগাছের ছায়া না মাড়িয়ে ঘুরে যেতে চেয়েছিল যে-কি অমোঘ নিয়তি, তার পায়ের কাছে, প্রায় তার সমবয়সী এক খেজুরগাছ ছায়া দোলাচ্ছে, আজ। সকল দেবতাকে মধু দেওয়া হলো না এই জীবনে। তাতে কি! কাব্যদেবীর বর পেয়েছিল সে এবং এই-ই চেয়েছিল, আর কিছু নয়। সব এক্সপেরিমেন্ট শেষ হওয়ার পর, অনন্তর, শুরু হলো খেজুরগাছের সঙ্গ।’
সমাধি থেকে ফিরি। শামীম কবীর আমার সঙ্গে সঙ্গে আসেন। ব্যাখ্যার বারান্দা খুলে দেন। বলেন, তার কবিতায় মৃত্যুচিন্তা সন্ধান করা বাতুল কর্ম; মরে গিয়ে তিনি বরং বেঁচে থাকা বেছে নিয়েছিলেন। বলেন, আত্মহত্যার ‘হত্যা’টা নয়, তিনি বরণ করেছেন আত্মাকে।
তারপর, তার সাড়ে চব্বিশ বছরের আয়ুমালা আর তাকে ছাড়া আমাদের সাড়ে ছাব্বিশ বছরের কবিতা করে খাওয়াকে দূরে দাঁড়িয়ে দেখি। আমাদের অন্তরের আপসী আস্তানা আর উচ্চারণে গতিশীল শয়তানিকে জাজ্বল্য করে দিতে দেখি ছাব্বিশ বছর আগে কবর বেছে শুয়ে পড়া শামীম কবীর ছেলেটাকে। সুররিক্ত আমাদের সে শোনায় তার অলীক অগীতল-বাদন
‘আবেগ বা প্রক্ষোভের প্রশ্ন নয় আজি/
শুধু আমি মনে ক’রতে চাই
স্মৃতি শক্তি টির-ধারক ও বাহকের/
কোন স্নায়বিক গুহ্যপথে
থ্যালামাস পিয়ানো বাজার সাথে সাথে/
হলুদমিশ্রিত ত্বকে ফ্লুরোসেন্ট ভালোবাসা দেবো।’
প্রেমগ্রহণ নাকি শিশ্নদান? রাজহংস শিকারের ঊরুজলে এমন বহু প্রশ্নে রক্তাক্ত হয়ে ‘ছাদের ওপর থেকে জন্মদিন থেকে ষোলোতলা লাফ দিয়ে শঙ্খ ঘোষ’-কে পেয়ে বোর্হেসের পোলাপানের সঙ্গে মোলাকাত সাঙ্গ করে শামীম কবীর ফালি ফালি করে কাটেন সভ্যতার উভকামী আত্মারাম। ধাবন্ত ফুলের তোড়া হাতে স্বয়ং বৃক্ষ এবং বৃক্ষা তাকে স্বাগত করছেন মুনমুন ফার্মেসিতে। বাইরে বেহদ্দ চলে নীলিমা-শিকার; গানের বাকসো হাতে ঋষি খর্পর বাইশখণ্ড ধ্যানের অন্তঃসার বাজারের ব্যাগে করে শামীম কবীরকে গছিয়ে দিতে চায়। কিন্তু শামীম সেটা সবলে ছুড়ে ফেলে দেয় কারণ বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতায় সে চাক্ষুষ করেছে এমন সাররিয়াল
‘প্রভু তুই দূর হ’ তিনতলা ব্রিজের ওপার/
বৌ লয়ে সেই ঘামে সেদ্ধ করে সংসারের ডাল।’
ডালের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বুঝি ভাতটা তো শামীমের কাছেই রয়ে গেছে এভাবে
‘এমন আতপ মৃত্যু মাটি শুধু
মৃত্তিকাই পুঁতে রাখা জানে।’
আতপ চাল না, আতপ মৃত্যু। বুঝলে হে! বাংলা কবিতায় তা পাওয়া যায় শামীম কবীরের ‘আমার ঘর’ কবিতাটার সীমাসহরদে
‘এখন সময় হ’লো
আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে ফেরার/
আমি দুপায়ের হাড় বাজিয়ে ফিরবো/
আমার ঘরে
না কোনো ফুলের ঝাড়
কেবল মৃত্যু
আমার ঘরে কী সুন্দর সাজানো’...
