সমুদ্রের ঢেউ কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। ঠিক তেমনি মানবতার নৌকা কখনো ভেসে চলে আশার বাতাসে, আবার কখনো হারিয়ে যায় নিষ্ঠুরতার জোয়ারে। পৃথিবীটা যেন আজ বিশাল এক জলরাশি, যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত। আর সেই লড়াইয়ের মাঝেই কিছু মানুষ হাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানে গন্তব্য হয়তো দূর, ঝড় আসবে, তবুও তারা যাত্রা থামাতে পারে না। ফ্লোটিলা তাদের প্রতীক। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু এর ফলে ফ্লোটিলার শক্তি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বন্দিদের মুক্তি, সহায়তার প্রবাহে কিছু বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় নীরবতার পরিবর্তে, কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে অনেক সরকার। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ পরিবর্তনগুলো যেন সাময়িক না হয়। যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন রোধ করতে হবে, বাধ্যবাধকতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অবরোধ পূর্ণভাবে উঠুক। গাজার মানুষ যেন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারে। তবে বিশ্বমানবতার প্রতীক হিসেবে ফ্লোটিলা কাজ করলেও, বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটুকু তা ভেবে দেখার বিষয়।
২০০৮ সালে গাজায় ইসরায়েলি অবরোধের সূচনা হয়। খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি প্রতিটি জীবনধারণের উপকরণ বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জন্য। সেই ভয়াবহ সময়েই বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মীরা মিলে শুরু করেন এক সাহসী উদ্যোগ Gaza Freedom Flotilla, যার উদ্দেশ্য ছিল অবরোধ ভেঙে গাজার মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। ২০১০ সালে তুরস্কের ‘মাভি মারমারা’ জাহাজ যখন এই মিশনে গাজামুখী হয়, তখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে ছিল। কিন্তু সেদিনই ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় নিহত হয় ৯ জন কর্মী। মানবতার নৌকা রক্তে রঞ্জিত হয়, তবু আন্দোলন থেমে যায়নি। সেই থেকে ‘ফ্লোটিলা’ হয়ে উঠেছে মানবতার প্রতীক, অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদের নাম।
প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে মানবাধিকারকর্মীরা নতুন ফ্লোটিলা যাত্রা শুরু করেন। নরওয়ে, স্পেন, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক সব দেশ থেকেই মানবতার এই আহ্বান শোনা যায়। ‘Women’s Boat to Gaza, Freedom Flotilla Coalition বা ‘Peace Flotilla’ প্রতিটি নামেই লুকিয়ে থাকে একটি মানবিক বার্তা, গাজার মানুষ একা নয়। ২০২৪ সালেও ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি নতুন ফ্লোটিলার উদ্যোগ নেন। তাদের লক্ষ্য একই, গাজার মানুষকে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বিশ্বকে জাগিয়ে তোলা। যদিও অধিকাংশ নৌযাত্রাই ইসরায়েলি বাহিনী আটকে দিয়েছে, তবু প্রত্যেকটি প্রচেষ্টাই পৃথিবীর বিবেককে নাড়া দিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। বিশ্ব জুড়ে চাপ, প্রতিবাদ ও মানবিক আবেদন শেষে ইসরায়েল সরকার ফ্লোটিলা অভিযানে আটক মানবতাবাদী স্বেচ্ছাসেবকদের মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে। এই মুক্তি মানে, কয়েকজন বন্দির ফিরে আসা নয় এটি মানবতার প্রতীকী বিজয়। যখন বন্দিরা মুক্ত হয়ে গাজা সীমান্তের পথে এগিয়ে গেলেন, তখন চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল একই প্রশ্ন এই মুক্তি কি যথেষ্ট? হয়তো না। কিন্তু এটি এক সূচনা, যা পৃথিবীকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে মানুষ এখনো বেঁচে আছে, বিবেক এখনো নিভে যায়নি।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষে যে দুঃসহ ট্র্যাজেডি বিশ্ব দেখেছে, তা শুধু রাজনীতি বা ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি ছিল মানবতার এক পরীক্ষা। শিশুর কান্না, নারীর আহাজারি, হাসপাতালে ধ্বংসস্তূপ সব মিলিয়ে গাজা যেন এক জীবন্ত কবরস্থান হয়ে উঠেছিল। এমন সময়ে যখন অধিকাংশ রাষ্ট্র কূটনীতির আড়ালে নীরব ছিল, তখন ফ্লোটিলা অভিযানের মানুষগুলো নীরব থাকতে পারেনি। তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জানাতে চেয়েছিল, আমরা এখনো পাশে আছি। সম্প্রতি যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের অঙ্গীকার রয়েছে, তার মধ্যে কিছু বন্দি মুক্তি একটি বড় অর্জন। যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে, হামাস কিছু জীবিত ও মৃত বন্দির লাশ হস্তান্তর করছে। ইসরায়েলও কিছু ফিলিস্তিনি বন্দিকে রিলিজ করবে বলে চুক্তি হয়েছে। এ পরিবর্তনে ফ্লোটিলা যেন নতুন শক্তি পেয়েছে। মানবতার আহ্বান শুধু একটি প্রচেষ্টা নয়, একটি বাস্তবতার দিকে ঠেলছে। বন্দিমুক্তি শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি সেই বিশ্বাসের প্রতীক যে, আন্তর্জাতিক চাপ ও নৈতিক শক্তিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব। ফ্লোটিলা-অংশগ্রহণকারীদের মুক্তি, যুদ্ধবিরতি সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। তবে অবরুদ্ধ জনগণের দেখার বিষয়, ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়ায়।
যুদ্ধবিরতির আগে অনেক দেশ ও সংগঠন ইসরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে এবং ফ্লোটিলা আটকে ফুঁসে উঠেছিল। এর মধ্যে তুরস্ক ফ্লোটিলার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলের হস্তক্ষেপকে ‘দস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, গাজা পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তায় দেশটি অব্যাহতভাবে সহায়তা করবে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গাজা ফ্লোটিলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, মালয়েশিয়া এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী সবাইকে সহায়তা করবে। ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিস মত্তা গাজা ফ্লোটিলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ফ্লোটিলার কার্যক্রম ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য সহায়ক। পাকিস্তান ফ্লোটিলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফ্লোটিলার ওপর হামলা না করার আহ্বান জানিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে বিবৃতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ ও নিন্দা। মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ওমান, কুয়েত, কাতার ও অন্যান্য আরব দেশ গাজাবাসীকে সমর্থন দিয়েছে এবং ইসরায়েলের নিন্দায় মুখর হয়েছিলেন নাগরিক, সিভিল সোসাইটির মানুষ। অবশেষে এলো মাহেন্দ্রক্ষণ যুদ্ধবিরতি।
কিন্তু যে প্রশ্নটি বারবার সামনে আসবে তাহলো যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব কতটুকু? এর ফলে যে শান্তির প্রত্যাশা আমরা করছি, তা কি বাস্তবসম্মত? যদি হয়, তাহলে দ্রুতই জয়ী হলো মানবতা। দেরিতে হলেও হতো। কারণ অত্যাচারী কখনো দীর্ঘসময় একচেটিয়া অপরাধ করে যেতে পারে না। বিশ্ব এখন অনেক বদলে গেছে। অজস্র দেশ তেমন দুর্বল নয়। যেমনটি ১০ বছর আগেও ভাবা হতো। এখন ভাবনায় পরিবর্তন আনতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে, আমিই সবসময় বিশ্বকে শাসন করতে পারব না। সামনে-পেছনে অনেক দেশ সমৃদ্ধ হয়েছে অর্থ ও অস্ত্রে। পররাষ্ট্রনীতিতেও তারা ভীষণ পারদর্শী। এ মুহূর্তে সবাইকে পাত্তা না দিয়ে এককভাবে কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। গতকাল জানা গেল তুরস্কের কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে, গতকালই শহিদুল আলমকে বিশেষ বিমানযোগে আঙ্কারায় নিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে তুর্কি কর্তৃপক্ষ শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। আঙ্কারায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমানুল হক বৃহস্পতিবার রাতে এ তথ্য জানিয়েছেন। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য স্বস্তির খবর।
আমরা শান্তির পক্ষে, মানবতার পক্ষে। বিশ্বে থেমে যাক, দেশে দেশে যত যুদ্ধ রয়েছে। কেবল বিরতি নয়, সমাপ্তি আসুক হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে। বাঁচুক মানুষ। ফিরে আসুক মুক্তি। প্রাণ ফিরে পাক, বিশ্বমানবতা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
