আগুন জ্বালায় আরও মৃত্যু। আবারও প্রমাণ হলো, বাংলাদেশ এখনো অতীত থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। গত ১৪ অক্টোবর ২০২৫, রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে একটি চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা পোশাক কারখানা এবং পাশের রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়, বহু মানুষ আহত হয়। অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেয়েছেন। যাদের প্রাণ গেল, তাদের অধিকাংশ আগুনে পুড়ে নয়, বরং রাসায়নিক পদার্থের বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাসের কারণে দম বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। উদ্ধারকারীরা জানান, ছাদের দরজা তালাবদ্ধ ছিল যেখানে আশ্রয় নিতে পারত অসহায় শ্রমিকরা। এ ধরনের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, এগুলো ছিল প্রতিরোধযোগ্য। মিরপুরের অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রমাণ করেছে আমাদের শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবহেলা, দুর্নীতি এবং দায়িত্বহীনতা কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে রাসায়নিক গুদাম এবং পোশাক কারখানায় আগুন লাগা এখন প্রায় নিয়মিত খবর। ঢাকার ঘিঞ্জি আবাসিক এলাকাগুলোতে আজও অসংখ্য অননুমোদিত রাসায়নিক গুদাম রয়েছে, যেগুলো একটি সময়-নিয়ন্ত্রিত বোমার মতোই বিপজ্জনক। ২০১০ সালে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন মারা গিয়েছিলেন, আর ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক গুদামে আগুন লেগে প্রাণ হারান ৭১ জন। প্রতিটি অগ্নিকান্ডের পর সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিশ্রুতি এসেছে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়া হবে, শিল্প নিরাপত্তা জোরদার করা হবে, কোড কঠোরভাবে মানা হবে। সময় গড়িয়েছে, প্রতিশ্রুতি ঝুলে থেকেছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, যা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড সেখানেও এই অনিয়মের চিত্র ভয়াবহ। বহু কারখানা স্থাপিত হয়েছে অননুমোদিত ভবনে, যেখানে জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ থাকে, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র অকেজো, আর শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ নেই। মিরপুরের ঘটনাটিও সেই পুরনো ব্যর্থতার আরেকটি ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি। প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে থাকে অজস্র মানবিক বেদনা। মিরপুরের আগুনে যেসব তরুণ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, তারা কেউ এসেছিলেন গ্রামের বাড়ি থেকে স্বপ্ন নিয়ে, কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আগুন নিভে যাওয়ার পর কারখানার সামনে স্বজনরা দাঁড়িয়ে ছিলেন হাতের মুঠোয় প্রিয়জনের ছবি নিয়ে। কারও দেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে, শনাক্ত করা যায়নি। এই ট্র্যাজেডিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে একটি সত্য প্রশাসন বহু আগেই জানত যে, মিরপুরসহ ঢাকা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক গুদামগুলো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। ফায়ার সার্ভিস বহুবার সতর্ক করেছিল। নিমতলী ও চকবাজারের ঘটনার পর সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, সব রাসায়নিক গুদাম কেরানীগঞ্জ বা মুন্সীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়া হবে। এমনকি টঙ্গী ও শ্যামপুরে অস্থায়ী স্থানান্তরের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেছে, প্রকল্পগুলো এখনো কাগজেই রয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই প্রকল্পগুলো কার্যকর হয়নি। ফলে আজও পুরান ঢাকাসহ মিরপুর, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর এলাকাগুলো রাসায়নিকের ‘টিকটিক করা বোমা’-তে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে শিল্প নিরাপত্তা তদারকির জন্য একাধিক সংস্থা কাজ করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, শিল্প মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর, কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তর। কিন্তু তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। বেশিরভাগ তদারকি হয় দুর্ঘটনার পর, প্রতিরোধের জন্য নয়।
অনেক কারখানা মালিক খরচ বাঁচানোর নামে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করেন না। আবার অনেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা ঘুষ দিয়ে অনুমোদন নেন। শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায়, আগুন লাগলে আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলায় প্রাণহানি বেড়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে কোনো কেন্দ্রীয় রাসায়নিক নিরাপত্তা তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কোনো জায়গায় আগুন লাগলে জানেন না, সেখানে কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মজুদ আছে। মিরপুরের ঘটনায় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও ব্লিচিং পাউডারের মিশ্রণে ভয়াবহ ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা দমকলকর্মীদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর আবেগ দেখিয়ে কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর আগের মতো চলতে থাকে। এই চক্র ভাঙতে হবে। রাসায়নিক আগুন রোধে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
প্রথমত, সরকারকে অগ্নিনিরাপত্তাকে আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র রাসায়নিক ও অগ্নিনিরাপত্তা কর্র্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন, যাদের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে অবৈধ বা অননুমোদিত স্থাপনা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার। দ্বিতীয়ত, রাসায়নিক গুদামগুলোকে আবাসিক এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া অপরিহার্য। কেরানীগঞ্জ বা মুন্সীগঞ্জে পরিকল্পিত শিল্প-জোন তৈরি করে সেগুলোতে স্থানান্তর করতে হবে। প্রতিটি গুদামে অগ্নিরোধী প্রাচীর, ধোঁয়া নির্গমন ব্যবস্থা ও নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ভবন নির্মাণ ও অগ্নিনিরাপত্তা কোড কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। অনুমোদনবিহীন কোনো কারখানা বা গুদাম চলতে দেওয়া যাবে না। প্রতিটি স্থাপনার বৈধ ফায়ার লাইসেন্স, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং জরুরি নির্গমন পথ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, কারখানা মালিকদের প্রকৃত নিরাপত্তা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে ফায়ার অ্যালার্ম, জলাধার, হাইড্রেন্ট, ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র এবং ব্যাকআপ পাওয়ারসহ জরুরি আলোকসজ্জা রাখতে হবে। প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। পঞ্চমত, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাসায়নিক ঝুঁকি, নির্গমন প্রক্রিয়া, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক প্রতিক্রিয়া শেখাতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় এনএফপিএ-এর মান অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
সবশেষে, দায়বদ্ধতার জায়গায় কঠোরতা আনতে হবে। যারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়া উচিত। একইভাবে, যে সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ বা প্রভাবে অননুমোদিত লাইসেন্স দেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শিল্প নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয় এটি মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা, আর মালিকের দায়িত্ব কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব তাদের জবাবদিহি দাবি করা। রূপনগরের আগুন কেবল একটি কারখানা পুড়ায়নি পুড়িয়েছে আমাদের দায়িত্ববোধ, আমাদের মানবিকতার মুখ। বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে বড় বাধা দুর্নীতি নয়, অবহেলা অন্যতম। এই কারণে বারবার পুড়ছে মানুষের স্বপ্ন, হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের মূল্য। এখনই সময়, আগুনের শিখার দিকে নয় আমাদের ভেতরের দায়িত্বহীনতার অন্ধকারের দিকে তাকানোর।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
