পুলিশে ক্ষোভ ও আতঙ্ক

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০২ এএম

বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে আফ্রিকার নামিবিয়ায় শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথম অংশগ্রহণ করে এরশাদ শাসনামলে। তখন থেকে বর্তমানে একটি অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি লাভ করেছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে আমাদের গর্বও ছিল। এই অংশগ্রহণ শুধু আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবিক সহমর্মিতার প্রতিফলন নয়, বরং শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত সদস্যরা যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন, তা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যাদের পুরো কনটিনজেন্ট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ক্যামেরুন, সেনেগাল ও মিসরের মতো দেশের কনটিনজেন্ট আংশিকভাবে কমছে। ‘সরকারের সক্রিয় উদ্যোগের অভাবে পুলিশ পুরোপুরি  কোণঠাসা। সরকার জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারছে না’ একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা এমন কথা বলেন। সত্যি কথা বলতে, কোন বিশেষ কারণে  জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে থাকা বাংলাদেশ পুলিশের একমাত্র অবশিষ্ট কনটিনজেন্টকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় এমন সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের পুলিশের দীর্ঘদিনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এটিই ছিল জাতিসংঘ মিশনে পুলিশের সর্বশেষ কন্টিনজেন্ট। ১৮০ সদস্যের ওই কন্টিনজেন্ট কঙ্গো যাওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় ফিরে আসার নির্দেশনা  পেল। কিন্তু এর নেপথ্যে কি শুধুই শান্তিরক্ষা মিশনের বাজেট ঘাটতি নাকি অন্যকিছু!

জাতিসংঘের শান্তি মিশনগুলোতে সবচেয়ে বেশি তহবিল জুগিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মোট তহবিলের ২৬ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে। এরপর চীন প্রায় ২৪ শতাংশ তহবিল জোগান দেয়। এর মধ্যে কি কোনো ধরনের বৈরিতা সৃষ্টি হয়েছে? ডিআইজি পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি। মিশনের বাজেট ঘাটতির কারণে একটি কন্টিনজেন্ট ফেরত আসবে। বাজেট সমস্যা দূর হলে আবার হয়তো কঙ্গো বা অন্য কোনো দেশে প্রয়োজন হলে নতুন কন্টিনজেন্টকে ডাকা হবে।’ সম্প্রতি রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কয়েক মাসে বিশ্বব্যাপী ৯টি মিশন থেকে অন্তত ২৫ শতাংশ শান্তিরক্ষী কমাবে জাতিসংঘ। এমন সিদ্ধান্তের মূল কারণ অর্থ ঘাটতি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ তহবিলের অনিশ্চয়তা। এর কারণে ১৩ থেকে ১৪ হাজার সৈন্য ও পুলিশ এবং উল্লেখযোগ্য  বেসামরিক কর্মী এই ছাঁটাইয়ের আওতায় আসবেন। এর ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবলদের মধ্যে। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা জরুরি বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে বলে পুলিশ সূত্র জানাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে ১৮০ জন পুলিশ সদস্যের দেশে ফেরত আসার কথা। পরে আরও সদস্যের দেশে ফেরত আসার শঙ্কা রয়েছে। আবার পুলিশের পাশাপাশি অন্য বাহিনীর সদস্যদেরও প্রত্যাহার করার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার অভিযোগ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতাই এর মূল কারণ।

এই মুহূর্তে সরকারের কী করণীয়, তা সরকার ভালো জানে। কারণ বাংলাদেশ পুলিশের ২১ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা বিশ্ব জুড়ে ২৪টি দেশে ২৬টি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাওয়া প্রত্যাশার বিষয়। সমস্ত বাহিনীর সদস্যের প্রত্যাশা থাকে, সেখানে যাওয়ার। জীবনের মায়া ত্যাগ করে তারা যান, কেবলমাত্র বড় ধরনের অর্থ উপার্জনের জন্য। কিন্তু হঠাৎ করে কেন তহবিল সংকটের কথা বলে, এমনটি হলো তা বড় ধরনের প্রশ্ন তুলবে। এই ঘটনা কোন ধরনের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সংকটকে ইঙ্গিত করে, তা সবাই আংশিক হলেও বুঝতে পারেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, আবার সুনামের সঙ্গে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে থাকবে পূর্ণ সময়ে। কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক মতানৈক্যের সুযোগ কোনো পক্ষ নিতে না পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত