কিছুই অর্জিত হয় না আন্দোলন ছাড়া

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৫, ১২:২৬ এএম

বাংলাদেশের রাজপথ যেন এখন আর কেবল প্রতিবাদের স্থান নয়, বরং ন্যায্য পাওনা আদায়ের একমাত্র কার্যকর মঞ্চ। শিক্ষক থেকে চিকিৎসক, কৃষক থেকে সরকারি কর্মচারী, প্রায় প্রতিটি পেশাজীবী গোষ্ঠী এখন রাস্তায় নামলেই যেন তাদের দাবি সরকার বা প্রশাসনের কানে পৌঁছায়। যেখানে যৌক্তিক নীতিনির্ধারণ হওয়ার কথা সেখানে আন্দোলনই যেন হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের প্রধান অনুঘটক। প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি এমন এক দেশে পরিণত হচ্ছে যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা না, বরং আন্দোলনের চাপ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে? সম্প্রতি সরকারি কলেজের শিক্ষকরা মাঠে নেমেছেন, তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বেতন, পদোন্নতি, পেনশন কাঠামো ও চাকরির স্থিতি নিয়ে। কয়েক মাস আগে চিকিৎসক সমাজের একাংশ তাদের নিয়োগ কাঠামো সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। সরকারি কর্মচারীরাও বেতন বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ কাজ বন্ধ রেখে, কেউ প্রতীকী অনশন করে, কেউ সড়ক অবরোধ করে নিজেদের দাবি জানাতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু এ চিত্র নতুন নয়।

কয়েক বছর আগে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষকরা ‘সমমর্যাদা’র দাবিতে রাজপথে। তারও আগে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা চেয়ে মানববন্ধনে। এমনকি কৃষকরাও তাদের পণ্যের দাম না পেয়ে, ধান রাস্তায় ছুড়ে ফেলার মতো দৃশ্য তৈরি করেছেন। দেখা গেছে, রিকশাচালকরাও অবৈধ রিকশা জব্দ ও নতুন রুটে চলাচলের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে সড়কে নেমেছেন। কেউ মিটিং করে, কেউ সড়ক আটকে, কেউ রিকশা উল্টে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ‘যে সিদ্ধান্ত আমাদের জীবিকার সঙ্গে জড়িত, তা নিয়ে অন্তত একবার কর্তৃপক্ষের কথা হোক।’ এই ছোট্ট কথাটাই আসলে বড় বাস্তবতা। নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে যারা সরাসরি জড়িত, তারা যেন সংলাপ টেবিলের বাইরে রয়ে যায়। ফলে মূল সমস্যা হলো, প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ ও কার্যকর নীতিনির্ধারণের ঘাটতি। প্রতিটি দাবি যখন বছর বছর পুঞ্জীভূত হয়ে অসন্তোষে রূপ নেয়, তখন সেটি বিস্ফোরিত হয় আন্দোলনে। সরকার বা কর্তৃপক্ষ তখন নড়েচড়ে বসে। তখনই সড়ক অবরোধ, অফিস বন্ধ বা মিডিয়ার চাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর ফলে মানুষ বুঝে গেছে ‘শান্তিমতো দাবি জানালে কিছু হয় না। সম্মিলিতভাবে সমস্বরে বললে শোনা যায়।’

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সমস্যার সমাধান জানলেও, অনুমোদন না পেলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেন না। ফলে বছরের পর বছর দাবিসমূহ ফাইলবন্দি থাকে। শিক্ষক-কর্মচারীদের টাইম স্কেল, পেনশন সুবিধা বা এমপিও আপডেট, সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স নিয়োগ ও ওষুধ সরবরাহ এবং পেনশনভোগী বা হতদরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা। এই দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ জনগণের আস্থা হ্রাস করেছে এবং রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে সংকট নির্ভর প্রশাসনে পরিণত করেছে। যেখানে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে, সংকট তৈরি হলে তা ‘দমিয়ে’ রাখা হয়। তখন আন্দোলনই হয়ে ওঠে কার্যকর মাধ্যম। কোনো ইস্যু পত্রিকা, টেলিভিশন স্ক্রল বা অনলাইন নিউজে আলোচিত হলে তবেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তর তৎপর হয়। সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, যখন মিডিয়ায় ‘শিক্ষকের মুখে রক্ত’ শিরোনামে ছবি ভাইরাল হলো, তখনই প্রশাসন আলোচনায় বসতে বাধ্য হলো। এটি এক ধরনের ‘মরাল হ্যাজার্ড’, যা প্রশাসনিক ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।

নিত্যদিনের এ আন্দোলন সংস্কৃতি কেবল রাজনীতি নয়, অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে। রাজপথে অবরোধ, কর্মবিরতি, অথবা প্রশাসনিক অচলাবস্থা উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। একইভাবে, শিক্ষা খাতে আন্দোলনের প্রভাবে পাঠদান বন্ধ থাকা বা পরীক্ষার সূচি পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এতে একটি প্রজন্মের শিক্ষাগত ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের উৎপাদনক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটাও সত্য, আন্দোলন মানেই বিশৃঙ্খলা নয়। অনেক ক্ষেত্রে আন্দোলন নাগরিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করে। ইতিহাসে দেখা গেছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই গণআন্দোলন, সবগুলোই বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানেও শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি বা কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা আন্দোলনের মাধ্যমেই আলোচনায় এসেছে। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন আন্দোলনই হয়ে ওঠে নীতিনির্ধারণের স্থায়ী বিকল্প। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী মত বা পরামর্শ গ্রহণের সংস্কৃতি খুব দুর্বল। ফলে কোনো গঠনমূলক সমালোচনাও অনেক সময় ‘বিরোধিতা’ হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়ই আন্দোলনকে ‘ষড়যন্ত্র’ বা ‘বিরোধী চক্রান্ত’ হিসেবে চিত্রায়ণ করে, ফলে বাস্তব দাবিও রাজনৈতিক রঙ পায়। এতে সমস্যার মূল জায়গা থেকে সমাধান সরে যায়।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে যখন দাবি মানতে আন্দোলন লাগবে না, বরং দায়িত্ববোধ থেকেই ন্যায্য সিদ্ধান্ত আসবে। ২৪ জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন দেখিয়েছে, শিক্ষার্থীরা নিজেদের ন্যায্য দাবি ভর্তি ব্যবস্থার সমতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ন্যায্য পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসনের চাপে না থেকে সরাসরি রাস্তায় নেমে সরকার এবং প্রশাসনকে প্রতিক্রিয়া দিতে বাধ্য করেছে। রাষ্ট্র, নাগরিক ও প্রশাসনের এ দূরত্ব যদি কমানো না যায়, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হয়তো বারবার রাজপথেই নিজের কণ্ঠ খুঁজবে। অথচ টেকসই উন্নয়ন ও শান্তির পথ সংলাপের মধ্য দিয়েই প্রসারিত হয়, সংঘাতে নয়। এটাই কি নতুন বাংলাদেশ?

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত