বহরে আসছে ‘প্রগতি’ ও ‘নবযাত্রা’

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৪৮ এএম

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনে (বিএসসি) শুরু হচ্ছে ‘প্রগতি’ ও ‘নবযাত্রা’র যুগ। আজ মঙ্গলবার লন্ডনে বাই পেপার বিএসসির বহরে যুক্ত হবে। তবে আগামী বৃহস্পতিবার ‘বাংলার প্রগতি’ নামের জাহাজটি চীনের জিংজিয়াং প্রদেশের জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নানইয়াংয়ের ইয়ার্ড থেকে সরাসরি বুঝে নেবে বিএসসি। অন্য জাহাজ ‘বাংলার নবযাত্রা’ বিএসসির বহরে যুক্ত হতে পারে আগামী ৫ ডিসেম্বর। আর এর মধ্য দিয়ে বিএসসির বহরে মোট জাহাজের সংখ্যা হবে সাতটি।

আজ বাংলার প্রগতি জাহাজটি বাই পেপার বুঝে নেওয়ার কথা জানিয়ে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (আজ) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে জাহাজটি বাই পেপার বুঝে পাব। বুঝে পাওয়ার পর বাস্তবিক অর্থে জাহাজটি রিসিভ করতে আমরা চীনে চলে যাব। সেখান থেকে ২৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটি রিসিভ করার পর পরদিন (২৪ অক্টোবর) থেকে বাণিজ্যিকভাবে ভাড়ায় পরিচালিত হবে।’

জাহাজ গ্রহণের আগেই কি ভাড়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে? এ প্রশ্নের জবাবে কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘জাহাজটি রিসিভ করার পর যাতে একদিনের জন্যও বসে না থাকে, সেজন্য আমরা ভাড়া দিয়েছি।

প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন ২০ হাজার ডলার ভাড়া পাওয়া যাবে।’

সর্বশেষ ২০১৮ ও ২০১৯ সালে চীন সরকারের ১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকায় আর্থিক সহায়তায় তিনটি করে ছয়টি জাহাজ কিনেছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। প্রথমবারের মতো এবারই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৯৩৫ কোটি টাকায় দুটি জাহাজ কিনছে। নতুন কেনা এ দুই জাহাজের দৈর্ঘ্য ১৯৯ মিটার ও প্রস্থ ৩৩ মিটার। ১৮ মিটার গভীরতার বাল্ক ক্যারিয়ার হিসেবে পরিচিত ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’ প্রতিটি ৬৫ হাজার টন পণ্য বহন করতে সক্ষম। এ দুই জাহাজ থেকে বছরে ২০০ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছে বিএসসি। আয়কৃত এ টাকার মধ্যে নিট লাভ থাকতে পারে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।

আগে যেখানে পাঁচটি জাহাজ থেকে গড়ে ৩০০ কোটি টাকা আয় হতো, এখন সেখানে বছরে এ দুই জাহাজ থেকে ২০০ কোটি টাকা কীভাবে আয় করবেন? এ প্রশ্নের জবাবে কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘বিদ্যমান জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা ২৭ হাজার টন। আর নতুন এ জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা প্রতিটি ৬৬ হাজার টনের। প্রায় দ্বিগুণের বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ থেকে আয়ও বেশি আসবে এটাই স্বাভাবিক।’

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিএসসির বহরে একসময় ৪৪টি জাহাজ ছিল। কিন্তু নানামুখী অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় বিএসসি লোকসান দিতে দিতে একেবারে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। একপর্যায়ে ২০১৮ সালে এসে সংস্থার বহরে জাহাজের সংখ্যা মাত্র দুটিতে নেমে আসে। পরে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনটি এবং ২০১৯ সালে তিনটি মিলে ছয়টি জাহাজ নিয়ে বিএসসির বহর উন্নীত হয় আটটি জাহাজে। ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে বিএসসির বহর আবার সাতটি জাহাজে নেমে আসে। গত বছর অক্টোবরে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৩৭ বছরের পুরনো ‘এমটি বাংলার সৌরভ’ ও ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ জাহাজ দুটি অগ্নিকা-ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে পরবর্তীকালে ৫৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হলে বিএসসিতে জাহাজের বহর নেমে আসে পাঁচটিতে।

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অনুযায়ী, যেকোনো দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ দেশীয় ক্যারিয়ার, ৪০ শতাংশ বিদেশি ক্যারিয়ার এবং বাকি ২০ শতাংশ দেশি ও বিদেশি ক্যারিয়ার যৌথভাবে পরিচালনা করে। বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০২টি জাহাজ দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে মাত্র ১১ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। সামুদ্রিক নৌবাণিজ্যে জাহাজ থেকে আয়ের অপার সম্ভাবনার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ যত বাড়বে, দেশের নাবিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তত বৃদ্ধি পাবে। নাবিকদের বেতনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা। আবার এসব জাহাজ অন্যান্য দেশের পণ্য পরিবহন করেও ভাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলোতে বিদেশি ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও নাবিকরা চাকরি করেন। বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ হলে বাংলাদেশি নাবিকদের যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনিভাবে তাদের বেতনগুলোও দেশে থাকবে, ডলার হয়ে বাইরে যাবে না। আবার এসব জাহাজের ভাড়ার টাকাও দেশে থাকবে। সব মিলিয়ে দেশের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’

তবে জাহাজ পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসি দেশীয় পণ্য পরিবহনের চেয়ে ভিন্ন দেশের পণ্য পরিবহনে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে আসছে। গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) জাহাজ ভাড়ার মাধ্যমে ২৮৯ কোটি ৫০ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩২১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৯৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয় করেছে। বিএসসির কোনো জাহাজ দেশে চলাচল করে না। এগুলো বিশ্বের এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে যাতায়াত করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত