জীবনানন্দ দাশ-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এর প্রথম কবিতার নাম, ‘আমি কবিসেই কবি’। ‘আমি কবি,সেই কবি, আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি।’ যদিও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পা-ুলিপি’র ভূমিকায় নিজের প্রথম কবিতার বইকে তিনি অস্বীকার করেছেন। সে কথা আলাদা। ‘ঝরা পালক’-এর ছবির কারিগর কবির মানসচিত্র কেমন ছিল? জীবনানন্দের মানসচিত্র বর্ণনা করতে তার মনের স্তর বিভাজন করে কবির একটি অবয়ব আঁকার চেষ্টা করি।
‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র একটি কবিতা, ‘সারা দিন মিছে কেটে গেল, সারা রাত বড্ড খারাপ, নিরাশায় ব্যর্থতায় কাটবে, জীবন দিনরাত দিনগতপাপ’। জীবনানন্দের আবেগের স্তর ছিল নিঃসঙ্গতা, বিষণœতা আর আশ্চর্য সৌন্দর্যবোধে ভরপুর। তিনি জটিল আবেগে আচ্ছন্ন থাকতেন, সৌন্দর্য তাকে মোহিত করত, কিন্তু সেই সৌন্দর্যও বিষণœতায় ঢাকা। তার মনের গভীরে যে নিঃসঙ্গতা বাস করত তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, যেন এক মহাকালের নিঃসঙ্গতা। তিনি বনের মাঝে একাকী হাঁটতেন। বন-পথ, ধানের ক্ষেত, কিংবা রাতের স্তব্ধ আকাশের নিচে, সব বাসনাকে পাশে রেখে সাধকের ধ্যানে নিঃশঙ্ক অপ্রতিরোধ্য কবি হেঁটে যেতেন বহুদূর।
সঞ্জয় ভট্টাচার্য জীবনানন্দকে বলেছেন প্রেমিক কবি, প্রেমের কবি নয়। কবির প্রেমের স্তর ছিল জীবন আর মৃত্যুকে আকীর্ণ করে। ‘নির্জন স্বাক্ষর’ কবিতায় লিখেছেন, ‘হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন/পথের পাতার মতো তুমিও তখন/আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?’ জীবন কবিতায় আছে, ‘মৃত্যুরে ডেকেছি আমি প্রিয়ের অনেক নাম ধরে।’
প্রেমের হাত ধরে আসে বিচ্ছেদ, প্রেমের হাত ধরে আসে প্রেমহীনতাও। প্রেম চিরন্তন, কারণ প্রেমের মৃত্যুর পরও প্রেম থেকে যায়। সেই প্রেম থাকে স্মৃতিতে। কিন্তু প্রেমের অনিবার্য সমাপ্তিও চিরসত্য। ‘দুজন’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘প্রেম ধীরে মুছে যায়/নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।’
আবার তুমুল প্রেমের কবিতাও লিখেছেন তিনি, ‘অনেক আকাশ’ কবিতায়, ‘সব ছেড়ে দিয়ে আমি তোমারে একাকী ভালোবেসে/ তোমার ছায়ার মতো ফিরিয়াছি তোমার পিছনে/ তবু হারায়ে গেছ/হঠাৎ কখন কাছে এসে/ প্রেমিকের মতো তুমি মিশেছ আমার মনে-মনে/ বিদ্যুৎ জ¦ালায়ে গেছ/ আগুন নিভায়ে গেছ গোপনে।’
কবির দার্শনিক স্তর ছিল জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্ব আর চিরন্তনতা নিয়ে। তিনি সেই কবি যিনি, ‘জীবনের পারে থেকে যে দেখেছে মৃত্যুর ওপার।’ অথবা এমন অতল গভীর কথা কে বলতে পারে! ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়।’ মৃত্যু যেন ভয়ের নয়, বরং গভীর চিন্তার, মৃত্যু হলো তার কাছে জীবনের থেকে অন্যলোকে রূপান্তরের গল্প। সারাজীবনভর তিনি জীবন আর মৃত্যুকে একই সঙ্গে দেখার চেষ্টা করেছেন, লিখেছেন, ‘একবার মৃত্যু লয়ে একবার জীবনেরে লয়ে/ঘূর্ণির মতন বয়ে যে বাতাস ছেড়ে তার মতো গেছি বয়ে!’
তার মনের এক প্রকৃতি-সংশ্লিষ্ট স্তর ছিল। পবিত্র সরকারের মতে, ‘জীবনানন্দ আবার এমন একজন কবি, যার প্রায় প্রত্যেকটি কবিতায় নিসর্গ কোনো না কোনোভাবে অবস্থান করে।’ আমাদের মতো মানুষদের কাছে প্রকৃতি যেন সৌন্দর্যের উপাদান জীবনানন্দের কাছে তা ছিল স্মৃতি, যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি আর একান্ত নিজের আশ্রয়স্থল। নদী, ধানক্ষেত, নিঝুম বন সবই যেন তার মনের প্রতিধ্বনি। এই প্রকৃতিতেই তিনি খুঁজে পেতেন এক চিরন্তন প্রশান্তি যেখানে সময় থেমে যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন,
প্রকৃতি ও মৃত্যু একে অপরের পরিপূরক; জীবনের অন্তেই প্রকৃতির চিরচেনা ছন্দ। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ কবিতায় তিনি মৃতপ্রায় বাংলার মাঝেও এক অনন্ত রূপ আবিষ্কার করেন। বাংলাকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন আলোকসামান্য এক পঙ্্ক্তি, ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছেসবচেয়ে সুন্দর করুণ।’ প্রকৃতি নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন ‘রূপসী বাংলা’য়। এই কবিতাগুলো ‘ধূসর পা-ুলিপি’র সমসাময়িক লেখা কবিতা, একটি খাতায় মলাটবন্দি ছিল রূপসী বাংলার কবিতাগুলো। কবির জীবদ্দশায় কবিতাগুলো প্রকাশিত হয়নি। তার ‘রূপসী বাংলা’র চালতা ফুল ভেজে শিশিরের জলে, লক্ষ্মীপেঁচা গান গায় আর খেয়ানৌকা চরের খুব কাছে এসে লেগে থাকে। কাঁঠাল পাতা ঝরে যায় ভোরের বাতাসে, শালিখের ডানা সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে। অন্ধকার জেগে ওঠে ডুমুরের গাছে, গাছের বড়ো পাতার নিচে দোয়েল পাখি বসে থাকে। আকাশ চলে যায় কোথায় আকাশে, অপরাজিতার মতো নীল হয়ে। সে আকাশ পাঙনায় নিঙড়িয়ে ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে। সেখানে বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে থাকা যায় আর পশমের মতো লাল ফল ঝরে বিজন ঘাসে। বাঁকা চাঁদ জেগে থাকে, লক্ষ্মীপেঁচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে শোনায় লক্ষ্মীর গল্প। ভাসানের গান শোনায় নদী। চারদিকে নরম ধানের গন্ধ, কলমির ঘ্রাণ হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটিদের মৃদু ঘ্রাণ, চারদিকে ক্লান্ত নীরবতা। পৃথিবীর আর কোথায় আছে এমন বিজন ঘাস, যারা প্রান্তরের পারে বিমর্ষ চোখে চেয়ে থাকে। আরও আছে কাচপোকা, প্রজাপতি, শ্যামাপোকা। কিশোরেরা বেতের নরম ফল, নাটা-ফল খেতে আসে, এসে ধুন্দল বীজের খোঁজ করে ঘাসে ঘাসে। বাদলের দিনে ধলেশ্বরীর চরায় গাঙশালিকের ঝাঁক, এরা যেন আজকের নয়, যেন এরা কালীদহে ভাসে। চারদিকের দৃশ্যরা মলিন, শান্ত। ভেরে-া ফুলে নীল ভোমরারা ঘুরছে, সাদা দুধ ঝরে পড়ছে করবীর, কোনো এক কিশোরী ফুল ছিঁড়ে নিয়ে গেছে, তাই দুধ ঝরা থামে না ফুলের। মেয়েদের চালধোয়া স্নিগ্ধ হাত, ধানমাখা চুল, শাড়ির কস্তা পাড়। গাছে ডাঁসা আম, কামরাঙা, কুল। সন্ধ্যায় দাঁড়কাক উড়ে চলে যায় তাল বনে। চড়াই পাখি কাঁঠালি চাঁপার নীড়ে ঠোঁট গুঁজে থাকে। হলুদ পাতা মিশে থাকে উঠানের খয়েরি পাতায়। পুকুরে হাঁস ভাসে, সোঁদা জলে শিশিরের গন্ধ পায়। শামুক পড়ে থাকে শ্যাওলার মলিন সবুজে। লালশাক ছাওয়া মাঠ, ইচ্ছে করে ঠেস দিয়ে বসে থাকি বুনো চালতার গায়। হেলেঞ্চার ঝোপে একঝাঁক জোনাকি, বাঁশ বন, শুকনো বাঁশের পাতা-ছাওয়া মাটি গভীর হয়ে আসে। হিজলের বাঁকা ডাল গুঞ্জরণ করে। যে শালিক মরে যায় কুয়াশায়, তা আর ফিরে আসে না। বিশুষ্ক পদ্মের দিঘি, ভেরে-া ফুলে ভীমরুল গান গায়। চারদিকে মাদারের ডুমুরের সোঁদা গন্ধ। পরথুপী ঘাস ছড়িয়ে আছে প্রান্তরে প্রান্তরে। কাঁঠাল পাতার থেকে নেমে আসে পেঁচা। আসন্ন সন্ধ্যায় করুণ কাকের দল নীড় খোঁজে। দুপুরে ঘাসের বুকে সিঁদুরের মতো রাঙা লিচু মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। কুয়াশায় ঝরে পড়ে রূপশালী ধান, নিমপেঁচা অন্ধকারে গান গায়। বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণ।
কবির অবচেতনের স্তর ছিল স্বপ্ন, স্মৃতি ও সময়-চেতনায় ভরপুর। প্রায় স্বপ্নময় এক ধরনের আধা-বাস্তব, আধা-অলৌকিক জগতে কবি বসবাস করতেন। সেই কল্পনার জগতে অতীত, হারানো ভালোবাসা, প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি বারবার ফিরে এসেছে। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় আমরা পাই সেই ভুবনের দেখা, যখন কবি হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকার পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন তার প্রত্যাশার নারীর কাছে। যিনি তাকে শান্তি দিয়েছিলেন। কবির অবচেতনে জেগে থাকে তার কবিতার অদ্ভুত সব চিত্রকল্পযা আধুনিক চিত্রশিল্পের মতো বিমূর্ত ও গভীর।
কবির অস্তিত্ববাদী স্তর ছিল সংশয়, নিরর্থকতার মানে খোঁজার আকুলতার মাঝে। উপনিবেশ, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, ও দেশভাগএসব ইতিহাস তার মনকে আঘাত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের আশাবাদ থেকে আলাদা হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক আধুনিক, দ্বিধাগ্রস্ত আত্মা। প্রদ্যুম্ন মিত্র লিখেছিলেন, ‘মানব-অস্তিত্বের আকস্মিকতা, চেতন ও নির্মাণের এক অগোচর দ্বন্দ্ব, চৈতন্যের আততি এবং এক বিপন্ন অস্তিত্বের বিমূঢ়তা আর শূন্যতার বোধই তার চেতনাকে আত্মসত্তার আধুনিক অভিজ্ঞানে উন্মুক্ত করেছিল।’
কবির ছিল এক নীরব দর্শকের স্তর। সেই স্তরে আত্মপর্যবেক্ষণ ছিল সর্বাগ্রে। তিনি উচ্চকণ্ঠ কবি নন বরং এক নীরব আত্মা, যিনি নিঃশব্দে অনুভব করতেন জগৎকে। তার কবিতা যেন কোনো গোপন ডায়েরির পাতা যেখানে তার নিজের কাছে নিজেকে বলা কথাগুলো লেখা। তার দেখার চোখ ছিল গভীর, কিন্তু বলা ছিল মৃদু, এই মৃদুতা তার কবিতাকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা বাংলা কবিতাকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে। জীবনানন্দের কবিতার নানা স্তর আমাদের জীবনের বিভিন্ন দিককে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আমরা দেখলাম তার কবিতায় প্রকৃতির অপরূপ চিত্রায়ণ আমাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। জীবনানন্দের কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগ ও মানবিক সম্পর্কের জটিলতা ফুটে উঠেছে। তিনি প্রেম, বিরহ এবং হতাশার মতো অনুভূতিগুলোকে এক নতুন ভাষায় প্রকাশ করেছেন। আমরা দেখি তার কবিতায় সমাজের প্রতি, সমালোচকদের প্রতি একটি সূক্ষ্ম সমালোচনা রয়েছে। ‘সমারূঢ়’ কবিতায় লিখেছেন, ‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা/বলিলাম মøান হেসে, ছায়াপি- দিল না উত্তর।’ তিনি সমাজের অসংগতি ও বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবনা পরিবর্তনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে জীবনানন্দ দাশ আমাদের শেখান যে, কবিতা শুধু শব্দের খেলা নয়, বরং এটি আমাদের অন্তরের গভীরে প্রবাহিত একটি অনুভূতি। তার কবিতার স্তরগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িত এবং তার একেকটি কবিতার মাধ্যমে আমরা জীবনের নানা দিককে অনুধাবন করতে সক্ষম হই। তার এই কবিতামালা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নতুন করে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং আমাদের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে।
