তো  মা  দে  র   ব  ই

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:২২ এএম

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ঈশপের পৃথিবীতে স্বাগতম!

ছেলেবেলায় ঈশপের গল্প পড়েনি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। চমৎকার অলংকরণের সঙ্গে যে গল্পগুলো পরিবেশিত হতো সেগুলো একদিকে ছোট বলে পড়তে যেমন কোনো কষ্ট হতো না, তেমনি ছিল রসময়। তবে গল্পগুলো শুধু পড়ার মজার জন্যই নয়। গল্পের মাঝে অন্তর্নিহিত থাকত শিক্ষা। সেই শিক্ষাটিই যেন বিনা আয়াসে চিরস্থায়ীভাবে শিশু মনে আসন লাভ করতে পারে সে জন্যই এমন মনোহর গল্পের আকারে পরিবেশিত হয়েছে তা বেশ বোঝা যেত। শিক্ষা ব্যাপারটাতে যতই আপত্তি থাক না কেন, গল্পের শক্তির কারণেই ঈশপের গল্পগুলো থেকে দূরে থাকার কোনো উপায় ছিল না।

ঈশপের গল্পের সঙ্গে সবার সম্ভবত পরিচয়, মিথ্যাবাদী রাখালের গল্পের মাধ্যমে। সেই যে, এক রাখাল ছেলে পাহাড়ের ওপারে ভেড়া চরাতে যেত। গ্রামবাসীকে ভয় দেখাতে প্রায়ই চিৎকার করত, বাঁচাও! বাঁচাও! বাঘ এসেছে! বাঘ এসেছে! আর প্রতিবারই গ্রামবাসী দেখত বাঘ আসেনি। রাখাল মিথ্যা কথা বলেছে, তাদের বোকা বানিয়েছে। একদিন যখন সত্যিই বাঘ এলো সেদিন কিন্তু রাখালের শত চিৎকারেও কেউ এগিয়ে এলো না বাঁচাতে। সেদিন রাখালকে তার ভেড়া সমেত বাঘের পেটে যেতে হয়েছিল। এই গল্প পড়ে শোনানো বা বলার মাধ্যমে আমাদের অভিভাবকরা এই শিক্ষা মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না। মিথ্যা কথা বলার মাধ্যমে মানুষ নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে। তার বিপদেও কেউ এগিয়ে আসে না। এমনিভাবে গল্পের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নৈতিক শিক্ষাদানের এই পদ্ধতি শুধু আমাদের দেশে না, বরং সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় ও প্রচলিত। ফলে ভীনদেশি ঈশপ হয়ে উঠেছেন আমাদের দেশি মানুষ আর তাই যখন শুনি ঈশপ বিশে^র প্রায় সব দেশেই এভাবে মিশে আছেন তখন অবাক না হয়ে পারা যায় না। ঈশপ নানা দেশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছেন যে, ঈশপের জন্ম কোথায় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। বিশেষজ্ঞরা যে কয়টি স্থানের নাম বলেছেন তার প্রত্যেকটি নামের পেছনের বেশ শক্তপোক্ত যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। ঈশপকে সবাই নিজের করে দাবি করে। ফলে ঈশপ কে ছিলেন এই রহস্যের সমাধান করা সহজ ব্যাপার নয়। তেমনি আরেক রহস্যের আধার হলো ঈশপের গল্পগুলো। কেউ বুক ঠুকে বলতে পারে না ঈশপের গল্পসংখ্যা ঠিক কত। যেসব দেশে ঈশপের গল্প ভ্রমণ করেছে সেসব দেশের লোকগল্পও আদল বদলে ঈশপের গল্পরূপে হাজির হয়েছে। ফলে দেশ ও ভাষাভেদে ঈশপের মোট গল্পের সংখ্যা ভিন্ন। ফলে পৃথিবী জুড়েই ঈশপের প্রামাণিক গল্প পাওয়া কঠিন। এই দুই কঠিন কাজটি সহজ করে বাংলা ভাষায় পরিবেশনের কাজটি করেছেন অশোক দাশগুপ্ত। তার ঈশপের পশুপাখি বইটিতে তিনি ঈশপের সম্ভাব্য জন্মস্থান, পরিচয়, জীবনসংগ্রাম এবং প্রামাণ্য গল্পগুলোকে দুই মলাটের ভেতর আবদ্ধ করেছেন ছোট-বড় সবার জন্য। সাহিত্যিক, গবেষক, লোকশিল্পের শিক্ষার্থীদের যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করবে চিহ্ন থেকে ভাষা কীভাবে আমরা পেলাম সেই জ্ঞানগর্ভ প্রামাণ্য আলোচনা তেমনি শিশু-কিশোরদের অবাক করবে তাদের পাঠের বাইরেও রয়ে যাওয়া ঈশপের অন্য গল্পগুলো। গল্পগুলোর মালা গাঁথার সময় বড়দের কথাও যে মাথায় রাখা হয়নি তা নয়। সেজন্যই বুঝি গল্পগুলোর নীতিশিক্ষা গল্পের নিচে মুদ্রিত হয়নি। পাঠককে অবকাশ দেওয়া হয়েছে নিজেদের মাথা খাটাবার বা শুধুই গল্পের আনন্দ উপভোগ করার। তবে যারা সাহিত্যকে শুধু আনন্দের ব্যাপার বলে ভাবতে নারাজ তাদেরও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বইয়ের শেষে যুক্ত করা হয়েছে নীতিশিক্ষাগুলোও। এভাবেই ঈশপের পশুপাখি বইটি ভাষা গবেষণা বই, মিথের চরিত্র বিশ্লেষণের বই, নীতিশিক্ষার বইয়ের সঙ্গে নিখাদ পাঠকের জন্য গল্পের বইও হয়ে উঠেছে। প্রতিটি অধ্যায়ের প্রথমে শিল্পী মানবের অসাধারণ অলংকরণও এই প্রত্যয়ই দেয়। বইয়ের অসাধারণ প্রচ্ছদটিও তারই করা।

বইটি তোমাদের ভালো লাগবে। যে অংশটি এখন ভালো লাগছে সেটি এড়িয়ে যেতে পারো। পরে এক সময় দেখবে না ভালো লাগা অংশটিই যেন নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে। ঈশপের পৃথিবীতে স্বাগতম!

 সুলতানা রাজিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত