আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) নিষিদ্ধসহ ৬ দফা দাবি তুলে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ইন্তিফাদা বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে তারা এই সমাবেশ করে। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে একটিা বিক্ষোভ মিছিল শাপলা চত্বরের দিকে অগ্রসর হয়। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন মসজিদে জুমার খুতবায় ইসকনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন ইমামরা।
বিক্ষোভ সমাবেশে ইন্তিফাদা বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. মেহেদী হাসান, সদস্য আহমেদ রফিক ও ইসলামি বক্তা মুহাম্মদ জসীমউদ্দিন রহমানী বক্তব্য রাখেন। বক্তারা ইসকন নিষিদ্ধ ঘোষণা, টঙ্গীতে ইমাম গুমের ঘটনায় দায়ীদের গ্রেপ্তার, গাজীপুর ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার এবং রাষ্ট্রীয় নীরবতার নিন্দা জানান।
৬ দফা দাবি হলো ১। গাজীপুর ধর্ষণের ঘটনা ঘিরে পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ভিকটিমের প্রতি দোষারোপ বন্ধ করে পুলিশ ও প্রশাসনের আচরণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখে এনে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; ২। টঙ্গী এলাকার অপহরণ-হত্যা ও এ বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলকভাবে দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে; ৩। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘কাঠামোগত ইসলাম বিদ্বেষ’ ও ইসলামবিদ্বেষী আচরণ রোধে একটি জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে; ৪। মুসলিম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও রক্ষা ব্যবস্থাসহ আইনি কাঠামো গঠন করতে হবে; ৫। ইসলামবিদ্বেষ-বিরোধী কর্মকা-ে অগ্রণী যে ইমাম, সক্রিয় নাগরিক ও সংগঠনগুলো লড়াই করছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আহমেদ রফিক বলেন, ‘ইসকনের বিরুদ্ধে কথা বলায় এক খতিবকে অপহরণ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্র চুপ করে আছে, প্রশাসন অপরাধীদের রক্ষা করছে। সুশীল সমাজ বা রাজনীতিবিদদের কেউই দায়িত্ব নিচ্ছে না।’
মুহাম্মদ জসীমউদ্দিন রহমানী বলেন, ‘ইসকন কোনো ধর্মীয় সংগঠন নয়, এটি ইহুদি প্রভাবিত উগ্রবাদী গোষ্ঠী, যারা একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে।’
ডা. মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা বিচারের দাবিতে এসেছি। সরকার ন্যায়বিচার করলে আমরা শান্ত থাকব, কিন্তু বর্তমানে আমরা বিচার নয়, প্রহসন দেখছি। এমন গুরুতর ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও কোনো বক্তব্য নেই।’
ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে রাজধানী ঢাকায় ঢাকা বিবিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ও তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
আমাদের হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ইসকনকে দেশব্যাপী প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী ডাকবাংলো চত্বরে ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে আয়োজিত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হাটহাজারী উপজেলা শাখার ডাকা বিক্ষোভ মিছিল-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী বলেন, ‘এদেশে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ইসকন ইন্ডিয়ার এজেন্ট হিসেবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতায় লিপ্ত। সবশেষ, টঙ্গী বিটিসিএল টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মহিবুল্লাহ মিয়াজীকে জুমার খুতবায় সত্যোচ্চারণের কারণে পরপর ১২টি চিঠি পাঠিয়ে হুমকি দেওয়ার এক পর্যায়ে ইসকন সন্ত্রাসীরা তাকে গাজীপুর থেকে গুম করে। অবশেষে ওই ইমামকে সীমান্তবর্তী পঞ্চগড়ে শিকলে হাত-পা বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। আমরা এই গুমের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’
ইসলামী বিবিদ্যালয় (ইবি) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ইবি শিক্ষার্থীরা হিন্দুত্ববাদী চক্র কর্তৃক মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট, গাজীপুরে আশামনিকে ধর্ষণ, খতিব মহিবুল্লাহকে অপহরণ এবং চট্টগ্রামে আলিফ হত্যাসহ ইসকনের সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের প্রতিবাদ ও ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ইবি শিক্ষার্থীরা।
আমাদের বাকৃবি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল শিক্ষার্থী। দেশ জুড়ে ইসকন কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত ইমাম অপহরণ, নারী ধর্ষণ, হত্যার হুমকি ও দেশবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগ এনে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধের দাবি জানান তারা। গতকাল শুক্রবার দুপুর ২টায় জুমার নামাজ শেষে শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জব্বারের মোড়ে এসে শেষ হয়। সেখানে একটি সমাবেশ আয়োজন করেন বিক্ষোভকারীরা। এতে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
ইসকন নিষিদ্ধ চায় হেফাজতে ইসলাম : দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে হলে ইসকন নিষিদ্ধের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে গতকাল শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের সামনে এক সমাবেশে এসব কথা বলেন মহানগর হেফাজত ইসলামের নেতারা। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নেতারা চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা, বুয়েট ছাত্র শ্রীশান্ত রায়ের মুসলিম ছাত্রীকে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ঘটনায় ইসকন অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধের দাবি জানান। হেফাজত নেতারা বলেন, ‘যেভাবে অপরাধে জড়িত থাকার কারণে আওয়ামী লীগের মতো দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেভাবে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্যায়ের কারণে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই ইসকনের মতো উগ্র সংগঠনকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা অ্যাডভোকেট আলিফকে হত্যা করেছে। সারা দেশে ব্যাপক আকারে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামি নেতৃবৃন্দ ও ইমাম-খতিবদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এমনকি গাজীপুরে গুমের ঘটনায়ও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।’
তারা আরও বলেন, ‘সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি সরকার যেন এই সন্ত্রাসী সংগঠনকে অনতিবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে ইসকন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’
হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আলী উসমানের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম মহানগরের প্রচার সম্পাদক ইকবাল খলিলের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইযহার ও নাসির মুনির, কেন্দ্রীয় ছাত্র ও যুববিষয়ক সম্পাদক কামরুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, আব্দুল হালিম, রিদওয়ানুল ওয়াহেদ, আশরাফ বিন ইয়াকুব ও আনাস বিন আব্বাস।
