বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কারণে তার পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান শত শত কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)-এ এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাইফুল আলম ও তার পরিবারের পক্ষে মামলাটি করেছেন আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা কুইন ইমানুয়েল উরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভান।
সালিশি দাবিতে এস আলম পরিবার অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পদ জব্দ, ব্যাংক হিসাব স্থগিত ও ব্যবসায়িক ক্ষতি সাধনের অভিযান চালিয়েছে। এই পদক্ষেপের নেতৃত্বে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে গত বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর, এক ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
এই মামলা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেসাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের নিয়োগ করা একটি বিশেষজ্ঞ কমিশনের প্রস্তুত করা হোয়াইট পেপারে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, সেই পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং সরকারের গঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের প্রধান আহসান এইচ মনসুরের অভিযোগ, এস আলম গ্রুপ ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই বিপুল অর্থ এখন কোথায়?
অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপ এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আহসান এইচ মনসুরের উত্থাপিত অভিযোগের ‘কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই’ এবং তা ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’।
গত ডিসেম্বরে এস আলম পরিবারের আইনজীবীরা ইউনূস সরকারকে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, ছয় মাসের মধ্যে যদি বিরোধ মীমাংসা না হয়, তবে তারা আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার এস আলম পরিবারের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেছে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে, ভিত্তিহীন তদন্ত চালিয়েছে এবং গণমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ‘উস্কানিমূলক প্রচারণা’ পরিচালনা করেছে। এর ফলে ‘শত শত কোটি ডলার’ ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট পরিমাণ সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে পৌঁছালে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাব দেওয়া হবে।’ ড. ইউনূসের দপ্তর সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
এই সালিশি মামলা দায়ের করা হয়েছে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে ২০০৪ সালের দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির অধীনে। নথি অনুযায়ী, এস আলম পরিবারের সদস্যরা ২০২০ সালে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
তারা যুক্তি দিচ্ছেন, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে তারা বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আইন অনুযায়ী সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা মনসুর অভিযোগ করেছিলেন, এস আলম গ্রুপ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় একাধিক ব্যাংক জোরপূর্বক অধিগ্রহণ করে বিপুল অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটি ঋণ ও বাড়তি আমদানি বিলের মতো কৌশল ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়।
মনসুর বলেন, ‘আমরা বিপুল পরিমাণ প্রমাণ পেয়েছি, যা দেখায় তারা কত সম্পদ সরিয়েছে। বর্তমানে এসব ব্যাংকের মূলধন নেতিবাচক অবস্থায় এবং সরকারকেই এখন সেগুলো উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে এস আলম পরিবার দাবি করছে, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো উপস্থাপন করা হয়নি।
এ বছরের শুরুর দিকে আহসান মনসুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকার আর্থিক সমঝোতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে।
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের পরিবার বলছে, সরকারের পদক্ষেপে তারা শত শত কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অভিযোগ করছেন, পরিবারটি ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে সরিয়েছে। দুই পক্ষের এই বিরোধ এখন আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের হাতে গড়িয়েছে।
