দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করতে হবে

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১৪ এএম

পৃথিবীর প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। যার কোনো দায়িত্ব নেই সেও তার নিজের প্রতি দায়িত্বশীল। পরকালে যার যার দায়িত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মুসলমান হিসেবে আমাদের মাঝে কি এই বোধ আছে? কেউ কেউ তাকে আমলে নেয় না। যারা আমলে নেয় তারা সচেতনভাবে জীবনযাপন করে। দেশ ও দেশের মানুষ তাদের দ্বারা উপকৃত হয়। উপকৃত না হলেও কোনো ক্ষতিসাধন হয় না। সাধারণত দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী যারা আছেন তাদের অনেকের দায়িত্বে অসংগতির কোনো সীমা থাকে না। তাদের কোনো চিন্তাও নেই। ভাবেন, দুনিয়ার জীবনই শেষ। এরপর আর কোনো কিছু ঘটবে না, কারও সমানে দাঁড়াতে হবে না। এমন দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষতিকর। পরকালে জবাবদিহির ভয় কারও মাঝে না থাকলে বেপরোয়া হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে খুব। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মনে রেখো, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল। সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি)

দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির বিষয়ে হজরত ওমর (রা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ গল্প পাওয়া যায় তার বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে। যদিও সেটার সত্যতা নিয়ে অনেক কথা আছে। কিন্তু সেটা শিক্ষণীয়। ওমর (রা.) ছিলেন দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিদের একজন। একদা ওমর (রা.) তার এক বন্ধুকে বলেন, আমি মারা যাওয়ার পর জান্নাতে গেলে স্বপ্নযোগে তোমার সঙ্গে দেখা করব। তিনি ১০ বছর ২ মাস ১০ দিন শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তিনি শহীদ হন। তাকে কবর দেওয়া হয়। সেদিন থেকেই তার বন্ধু এই ভেবে ঘুমাতে যান, ওমর তো জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত। সে আজই জান্নাতে চলে যাবে। আজই তাকে স্বপ্নযোগে দেখতে পারব। কিন্তু তিনি ওমর (রা.)-কে স্বপ্নে দেখতে পেলেন না। এভাবে ১০ বছর ২ মাস ১০ দিন কেটে যায়, তিনি ওমর (রা.)-কে স্বপ্নে দেখেন না। অতঃপর ১০ বছর ২ মাস ১১তম দিনে তিনি ওমর (রা.)-কে স্বপ্নে দেখেন। তিনি দেখেন, ওমর (রা.)-এর চেহারা ভারক্রান্ত হয়ে আছে। জিজ্ঞেস করেন, তোমার এমন ভয়াবহ অবস্থা কেন? আর স্বপ্নে দেখা দিতে এত দেরি করলে কেন? ওমর (রা.) বলেন, শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের হিসাব দেওয়া যে কী কঠিন, তা বলে বোঝানো যাবে না। যদি আগে জানতাম তাহলে শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতাম না।এই গল্পের শিক্ষা হলো, ওমর বলতেন ফোরাতের তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, সেটার জন্য তিনি দায়ী থাকবেন। তিনি ১০ বছর ২ মাস ১০ দিন শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, এটার জন্য হিসাব দিতে তার সময় লেগেছে ১০ বছর ২ মাস ১০ দিন। এখন কথা হলো, ওমর (রা.)-এর পর পৃথিবীতে তার চেয়ে ন্যায়পরায়ণ শাসক আর কেউ আসবে না। তাহলে পরকালে তাদের অবস্থা কী হবে? তারা কি অনন্তকাল সময় পেলেও হিসাব দিতে পারবেন?

সম্প্রতি ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনের কাছে পিলারের প্যাড খুলে পড়ায় আবুল কালাম নামে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি হত্যা? এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো,

কর্র্তৃপক্ষের জবাবদিহির ঘাটতি এবং দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাই তার জীবনহানির কারণ। এর পেছনে ছিল দায়বদ্ধতা ও সততার অভাব। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি এবং মান নিয়ন্ত্রণে কিছুটা শিথিলতা ছিল। প্রকৌশল মানে ঘাটতি, তদারকি প্রক্রিয়ায় অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতার কারণে মানুষের জীবন এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। প্রাণনাশ করে বা প্রাণনাশের পরিস্থিতি তৈরি করে, এমন সব মাধ্যম ও কর্মকাণ্ডকে ইসলাম জোরালোভাবে নিষেধ করেছে। হত্যার শাস্তি ইসলামে খুবই কঠিন। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে অনুরূপভাবে হত্যা এবং ভুলবশত হত্যা করলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান দেওয়া হয়েছে ইসলামে। আবুল কালাম যেভাবে নিহত হয়েছেন তাকে ইসলাম ভুলবশত হত্যা হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। কেননা এটা মেট্রো কর্র্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার ফল। এই দুর্ঘটনায় কর্র্তৃপক্ষ নিহতের পরিবারকে মাত্র ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং নিহতের পরিবারে কেউ বেকার থাকলে তাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। মাত্র ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনরা মেট্রো কর্র্তৃপক্ষের তুমুল সমালোচনা করছেন। পরে দুই টাকা দেওয়ার জন্য মেট্রো কর্র্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে।

এক্ষেত্রে নিহতের পরিবার কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাবে, তা কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত দেশগুলোতে দেওয়া হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশত করে ফেললে (তা সম্পূর্ণ) ভিন্ন কথা। যে ব্যক্তি ভুলবশত কোনো মুমিনকে হত্যা করে, সে একজন দাস মুক্ত করবে এবং নিহত ব্যক্তির পরিবারকে রক্তের মূল্য পরিশোধ করে দেবে। তবে (স্বজনরা) যদি (ক্ষতিপূরণ) ক্ষমা করে দেয় (তাহলে তা ভিন্ন কথা)।’ (সুরা নিসা ৯২) এই আয়াতে যে ক্ষতিপূরণের কথা বর্ণিত হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ হলো নির্দিষ্ট বয়সের ১০০ উট বা সমমূল্য কিংবা মুদ্রার মাধ্যমে দিলে (হানাফি মাজহাব মতে) এক হাজার দিনার (এক দিনার সমান ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ) বা সমমূল্য কিংবা ১০ হাজার দিরহাম (এক দিরহাম সমান ২.৯৭৫ গ্রাম রুপা) বা সমমূল্য দিতে হবে। এই তিনটির যেকোনো একটি দ্বারা ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে। (হেদায়া ৪/৪৬০, রাওয়াইয়ুল বয়ান ফি তাফসিরি আয়াতিল আহকাম ১/৩৬০, ফাতহুল কাদির ৮/৩০৪) বর্তমান বাজার অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের ১০০টি উটের সর্বনিম্ন মূল্য ১৫ কোটি টাকা, ১ হাজার দিনারের মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা, ১০ হাজার দিরহামের মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।

লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত