স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক এবং একটি সাংবিধানিক। দেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য। দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। এটি ছিল রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে সেই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এবার ২০২৫ সালে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে পেতে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে ঐকমত্য কমিশন। এরপর কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও তাদের সম্মতির জন্য গণভোটের বিষয়ে সব দল একমত হয়েছে। কিন্তু তা কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন হবে তা নিশ্চিত নয়।
বিএনপি চায় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট। কারণ সনদের আইনি ভিত্তি অন্তর্বর্তী সরকার দিতে পারে না। গতকালের মধ্যে সনদের আদেশ জারির কথা বলেছে জামায়াতে ইসলামী। এনসিপি বলছে, বিএনপির মৃত্যু হবে ‘না’ ভোটের মাধ্যমে। অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ রাজনীতিতে ঐক্যের বদলে অনৈক্য বা বিভক্তি বৃদ্ধি করবে। এরই মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের যে সুপারিশমালা অন্তর্র্বর্তী সরকারের কাছে জমা দিয়েছে, সেটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে বিএনপি। দলটি বলেছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারির এখতিয়ার সংবিধান অনুযায়ী এ সরকারের নেই। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের সময়ে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, পরে মুদ্রিত পুস্তকে কয়েকটি দফায় পরিবর্তন থাকার কথা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত সনদের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছি। পরে প্রিন্টেড পুস্তক হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদের কপি আমরা হাতে পাওয়ার পর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে যে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্মত কয়েকটি দফা আমাদের অগোচরে ফের সংশোধন করা হয়েছে।’
অন্তর্র্বর্তী সরকার, ঐকমত্য কমিশন ও দুই-তিনটি রাজনৈতিক দল মিলে একটি পক্ষ তৈরি করেছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএনপি। নতুন করে বিএনপি জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ জামায়াতে ইসলামীর। আগামী ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের সময়। নতুন করে শুরু হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভাজনের মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, সময়মতো নির্বাচন না হলে ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা আরও নষ্ট হবে। মূল প্রশ্ন, সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজন কতটা কার্যকর হবে? রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও, সবার লক্ষ্য এক। সেটি হচ্ছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে পরাজিত শক্তি সুযোগ পেয়ে যায়। নির্বাচনকে কারা বিতর্কিত করতে চায়, তা চিহ্নিত করা জরুরি। সেই কারণে জরুরি ভিত্তিতে দলগুলোর মধ্যে সুকঠিন ঐকমত্য দরকার।
