২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেসরকারিভাবে মেয়র ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩ লাখ ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮টি। অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট।
নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় নাসিমন ভবনের দলীয় কার্যালয় মাঠে সংবাদ সম্মেলন করে শাহাদাত নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেছিলেন, ৪ হাজার ৮৮৫টি বুথের মধ্যে তার এজেন্টদের হাতে মাত্র ২০টি বুথের ফলের প্রিন্টেট কপি দেওয়া হয়েছে। ইভিএমে ভোট গণনা হলেও বাকি বুথগুলোর ফল দেওয়া হয়েছে হাতের লেখা। যেখানে কাস্টিং ভোটের সংখ্যা ও ভোটের ফল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেন তিনি।
এদিকে ওই বছর ১২ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন রেজাউল করিম চৌধুরী। নির্বাচন কমিশনের ফলে বিজয়ী না হলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা এ সময় ডা. শাহাদাতকে ‘জনতার মেয়র’ বলে আখ্যা দেন। ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নানা অনিয়ম তুলে ধরে নির্বাচনের ফল বাতিল চেয়ে চট্টগ্রামে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা করেন ধানের শীষের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন।
কী ছিল মামলায় : মামলায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ৯ জনকে বিবাদী করেন ডা. শাহাদাত হোসেন। বিবাদীরা ছিলেন নির্বাচন কমিশন ঘোষিত মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান, নির্বাচন কমিশন সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আবুল মনজুর, এম এ মতিন, খোকন চৌধুরী, মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ ও মো. জান্নাতুল ইসলাম। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভোটের দিন দুপুর পর্যন্ত ৪ থেকে ৬ শতাংশ ভোট পড়ে। কিন্তু কমিশনের হিসাবে দেখানো হয় ২২ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচনে ভোটের হিসাব চেয়েও পাওয়া যায়নি। কোনো কেন্দ্র থেকে ইভিএমের প্রিন্ট কপিও দেওয়া হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় নির্বাচনের নামে ওইদিন শুধু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এরপর দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমিনের আদালত ওই মামলায় ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে রায় দেয়। একই সঙ্গে ১০ দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করার জন্য নির্দেশ দেয় আদালত।
শপথ ও দায়িত্ব গ্রহণ : আদালত থেকে রায় এলেও শাহাদাত মেয়র হিসেবে শপথ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ আদালত থেকে যখন তিনি মেয়র হিসেবে রায় পেয়েছেন, তার আগেই দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়র অপসারণ করে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার তোফায়েল আহমদকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেনকে শপথ পড়ান অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ। ৫ নভেম্বর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
মেয়রের মেয়াদ : স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯- এর ৬ ধারা অনুসারে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভার তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। নির্বাচন কমিশনের ফলে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা করেন ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকে ডা. শাহাদাতের শপথের দিন পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়েছে তিন বছর আট মাস এগারো দিন। সে হিসেবে মেয়র হিসেবে ১ বছর ৩ মাস ২০ দিন মেয়াদ পাওয়াার কথা ডা. শাহাদাত হোসেনের।
