আফগানিস্তানে কেন এত ঘন ঘন ভূমিকম্প?

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৫, ১১:৪৯ পিএম

আফগানিস্তান ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম। সর্বশেষ গতকাল রবিবার মধ্যরাতে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মাজার-ই-শরিফের নিকটবর্তী এলাকায় ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে কমপক্ষে ২০ জনের মৃত্যু হয় এবং দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। এর আগে গত আগস্ট মাসের শেষদিকে অনুরূপ মাত্রার একটি ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী একাধিক পরাঘাতে ২ হাজার ২০০ জনেরও অধিক মানুষ প্রাণ হারায়। দক্ষিণ এশিয়ার এই যুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত দেশটিতে কেন এতবার ভূমিকম্প ঘটে এবং এর ভয়াবহতা হ্রাস করার উপায় কী? বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আফগানিস্তান ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সীমানায় অবস্থান করায় দেশটি তুলনামূলকভাবে অধিক ভূমিকম্পপ্রবণ।

রয়টার্সের মতে, পাথুরে পর্বতমালায় ঘেরা আফগানিস্তান একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশ। তবে দেশটির জন্য সবচেয়ে মারাত্মক দুর্যোগ হলো ভূমিকম্প। প্রতিবছর গড়ে ৫৬০ জনেরও বেশি মানুষ এই দুর্যোগে জীবন হারায়। ভূমিকম্পের ফলে প্রতিবছর আনুমানিক ৮ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

আফগানিস্তান ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের প্রান্তভাগে অবস্থিত। দেশটির হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণি বরাবর ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। এই দুটি প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষ ও ঘর্ষণের কারণে আফগানিস্তানে বারবার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অ্যারাবিয়ান প্লেটের প্রভাব লক্ষণীয়।

পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আফগানিস্তান, বিশেষ করে উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ভূমিকম্পের জন্য সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব অঞ্চলে ঘন জনবসতি এবং দুর্বল অবকাঠামোর ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

রাজধানী কাবুলও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে এই শহরে বার্ষিক গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলগুলোয় ভূমিকম্পের ফলে প্রায়ই ভূমিধস ঘটে, যা ব্যাপক প্রাণহানি এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে।

১৯৯০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে প্রায় ১০০টি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে ৬ দশমিক শূন্যমাত্রার একটি ভূমিকম্পে প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে একাধিক ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে এক হাজার মানুষ নিহত হয়। কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ২০১৫ সালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে ৩৯৯ জনের মৃত্যু ঘটে। ১৯৯৮ সালে মাত্র তিন মাসের মধ্যে দুটি ভূমিকম্পে যথাক্রমে ২ হাজার ৩০০ এবং ৪ হাজার ৭০০ জন প্রাণ হারায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের প্রভাব হ্রাস করতে নবনির্মিত ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে সহজে ধসে না পড়ে। পুরনো ভবনগুলোর জন্যও কার্যকর সংস্কার ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। উন্নতমানের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং পূর্বাভাস সতর্কতা প্রণালি স্থাপন করতে হবে। এতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা যাবে এবং জনগণকে সময়মতো সতর্ক করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তির সাহায্যে ফল্ট লাইন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মানচিত্র প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সহজে পুনর্বাসন বা স্থানান্তর করা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত