ইবনে কাসীর ক্যাডেট মাদ্রাসার বাড্ডা শাখার কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে কাজ করতেন সাইফুল ইসলাম (২৪)। আর একই মাদ্রাসায় রান্না ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন শাকিলা আক্তার (২০)। গত কয়েক মাস ওই ভবনে কাজের সুবাদে দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক। গত ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবারও মাদ্রাসায় উপস্থিত ছিলেন দুজনেই। ২৪ ও ২৫ অক্টোবর শুক্র-শনিবার হওয়ায় মাদ্রাসা বন্ধ ছিল। ২৬ অক্টোবর মাদ্রাসা খুলতে সাইফুলকে খবর দেওয়া হলে তাকে পাওয়া যায়নি। একই দিন শাকিলাও যাননি মাদ্রাসায়। দুজনের পরিবারকে জানানো হলে ২৭ অক্টোবর সাইফুল ও শাকিলা নিখোঁজের জিডিও করা হয়।
জিডির এক সপ্তাহ পর গত রবিবার বিকেলে ওই ভবনের নিজতলার পোশাক কারখানার ভেতর থেকে দুজনের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ভবটি থেকে দুর্গন্ধ এলে প্রথমে মৃত ইঁদুর ভেবে পরিষ্কার করানো হয়। কিন্তু গন্ধ না কমায় নিচতলার পরিত্যক্ত কারখানায় পরিষ্কার করতে যান ওই ভবনের আরেক কেয়ারটেকার সুলতান আহমেদ। তিনিই প্রথম লাশ দুটি দেখতে পান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) সফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জোড়া লাশ উদ্ধারের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন বাড্ডা থানা-পুলিশ। মরদেহগুলো গলিত হওয়ায় গতকাল সোমবার সকালে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ওই ভবনের আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। ভবনে সিসিটিভি আছে, কিন্তু তা নষ্ট। এ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। বাড়িওয়ালা, মাদ্রাসার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। সিসিটিভি সচল থাকলে তদন্তের কাজটি হয়তো আরও দ্রুত হতো।
উত্তর বাড্ডার পূর্বাঞ্চল ২ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাড়িটি ইবনে কাসীর ক্যাডেট মাদ্রাসা হিসেবেই পরিচিত। ভবনটির সামনে বিশাল এক মাদ্রাসার সাইনবোর্ড রয়েছে। তিনতলা বাড়িটির তৃতীয়তলায় ইবনে কাসীর ক্যাডেট মাদ্রাসা, দোতলায় বাড়ির মালিক আতিক পরিবারসহ থাকেন। নিচতলায় পরিত্যক্ত পোশাক কারখানা এমব্রয়ডারি ফ্যাক্টরি।
বাড়ির মালিক আতিক জানান, কয়েক দিন আগে তার স্ত্রী মারা যান। তিনি গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। সেখান থেকে গত শনিবার ফিরে বাসাবাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে পচা গন্ধ পান। পরে খুঁজে বেশ কয়েকটি মরা ইঁদুর দেখে তা ফেলে দেন। রবিবার সকালে আবার গন্ধ পেয়ে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। পরে নিচতলার পরিত্যক্ত কারখানায় পরিষ্কার করতে পাঠান কেয়ারটেকার সুলতান আহমেদকে। তিনিই প্রথম লাশ দুটি দেখতে পান এবং পুলিশে খবর দেন। তিনি আরও বলেন, বাড়ির সিসি ক্যামেরাগুলো অচল থাকায় ঘটনার কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভাষ্যমতে, নিচতলার কারখানায় ‘টিপ’ তালা দেওয়া ছিল, যা ভেতর ও বাইরে দুদিক থেকেই লাগানো যায়।
গতকাল বিকেলে ওই ভবনে তদন্তকালীন সময়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইব্রাহীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি। বাসার আশপাশে সিসি ক্যামেরা নেই। ভবনে সিসি ক্যামেরা আছে, তবে তা অচল অবস্থায় আছে। বাড়ির মালিক ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি। তারাও সহযোগিতা করছে।’
গত ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ওই মাদ্রাসায় কাজ করছেন বলে জানান মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা আলিম উদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাকিলা আমাদের মাদ্রাসায় রান্নার কাজ করতেন। আর সাইফুল কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। মাদ্রাসার সব চাবি থাকত সাইফুলের কাছে। ২৪ ও ২৫ অক্টোবর শুক্র-শনিবার থাকায় মাদ্রাসা বন্ধ ছিল। ২৬ অক্টোবর সকালে মাদ্রাসা বন্ধ দেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আমাদের ফোন দেন। আমরা বিকল্প চাবি দিয়ে মাদ্রাসা খুলে পাঠদান শুরু করি। কিন্তু সাইফুলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মোবাইল ফোন খোলা থাকলেও, তা ধরেনি। ওইদিনই সাইফুলের নিখোঁজের বিষয়ে তার পরিবার ও পুলিশকে জানানো হয়। এর মধ্যে শাকিলার মা এসে জানান, মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছেন না। দুজনের নিখোঁজের বিষয়ে ২৭ অক্টোবর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শাকিলার মা।’
এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেছে মৃত শাকিলার পরিবার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাড্ডা থানার ওসি হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গুরুত্বসহকারে মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে তদন্তের সঙ্গে আমরা এখন বিষয়টি প্রকাশ করছি না। দ্রুতই আসামি গ্রেপ্তার করা হবে।’
