পশ্চিমের আকাশে পারমাণবিক ডানা

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৫, ১২:২২ এএম

রাশিয়ার পারমাণবিক চালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ১৫ ঘণ্টা উড়ে প্রায় ১৪,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে, এক ফোঁটা জ্বালানি ছাড়া। সেই নীরব উড়ানের মধ্য দিয়ে মস্কো জানিয়ে দিয়েছে পশ্চিম আর অভেদ্য নয়। ভøাদিমির পুতিন কখনো নাটকীয় মুহূর্ত মিস করেন না। তিনি বলেছেন, ‘এটি এমন অস্ত্র, যা পৃথিবীর কারও কাছে নেই।’ তিনি ভুল বলেননি। ‘বুরেভেস্তনিক’ (ন্যাটোর ভাষায় এসএসসি-এক্স-৯ স্কাইফল) শীতল যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন থেকে যেন, জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে। এটি এমন এক ক্ষেপণাস্ত্র, যা তাত্ত্বিকভাবে চিরকাল উড়তে পারে। ডিজেল বা তরল জ্বালানি নয়, একটি ক্ষুদ্র পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরইর শক্তির উৎস। এটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন তেমনি ভয়াবহ যুগে এক পশ্চাদপসরণ যে যুগে প্রতিরোধ মানে ছিল, স্বমূলে ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা। দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা এক আরামদায়ক বিভ্রমে ছিল যেখানে সমুদ্র, উপগ্রহ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের সুরক্ষা দেবে। তারা মনে করত, আমেরিকার মূল ভূখণ্ড সবসময়ই নিরাপদ। যুদ্ধ যদি হয়ও তা হবে শুধু ‘অন্য প্রান্তে’। বুরেভেস্তনিক সেই ধারণা চূর্ণ করে দিয়েছে। এটি শুধু একটি অস্ত্র নয়, বরং এমন এক প্রযুক্তির প্রতীক যা অসম্ভব ভৌগোলিক দুরত্বকে সম্ভব করে দেয়। বারবার মনে করিয়ে দেয়, আত্মতুষ্টি কোনো প্রতিরক্ষা নয়।

এই ক্ষেপণাস্ত্রের মৌলিক গুণাবলি হচ্ছে, এর পারমাণবিক ইঞ্জিন এটিকে ২০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ার সক্ষমতা দেয়। উত্তর রাশিয়া থেকে উড্ডয়ন করে, এটি প্রশান্ত মহাসাগর ঘুরে আটলান্টিক পার হয়ে মিশন সম্পন্ন করতে পারে। ভয়াবহ ব্যাপার হলো এটি ভূমি থেকে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ মিটার উচ্চতায় উড়ে, ভূপ্রকৃতি অনুসরণ করে, রাডার এড়িয়ে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম। বুরেভেস্তনিক শুধু ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, এটি প্রতিরক্ষা নীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন এন্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে সরে যায়, মস্কো তখন প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দুই দশক পর, প্রতিক্রিয়াটি আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। বুরেভেস্তনিক শুধু অস্ত্র নয়, এটি ইউরেনিয়ামে গড়া ভূ-রাজনৈতিক এক নতুন ইস্যু। এটি ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেয়, ‘তুমি যত ঢালই বানাও, আমরা ছিদ্র খুঁজে নেব।’ পেন্টাগন এখন উপলব্ধি করছে, যেখানে প্রতিটি প্রতিরক্ষা হিসাব, প্রতিটি ব্যয়-মূল্যায়ন হঠাৎ অর্থহীন হয়ে গেছে। বর্তমান মার্কিন মিসাইল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, যেমন ভূ-উপগ্রহ ভিত্তিক ইনফ্রারেড ব্যবস্থা শুধু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু এত নিম্ন উচ্চতায় ও অনিয়মিতভাবে চলা পারমাণবিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তে সক্ষম নয়। বুরেভেস্তনিককে ট্র্যাক করা মানে হলো, অন্ধকার ঘরে মশা ধরতে স্পটলাইট ব্যবহার করা। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি দুঃস্বপ্ন। এমন এক হুমকি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষায় লাগবে হাজার হাজার ইন্টারসেপ্টর। ব্যয় করতে হবে কয়েকশ বিলিয়ন থেকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে এটি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, অর্থনৈতিক আত্মহত্যা। এখানেই রাশিয়ার কৌশলগত পদক্ষেপ পশ্চিমকে খরচে ক্লান্ত করে দেওয়া, নিজে নয়।

কিন্তু এ অস্ত্রের প্রভাব আরও গভীর। এটি শুধু প্রতিরক্ষা ভেদ করে না; এটি আত্মবিশ্বাসকেও ভেদ করে। সাত দশক ধরে, আমেরিকার বর্ধিত প্রতিরোধক্ষমতা (যে প্রতিশ্রুতিতে তারা তাদের মিত্রদের পারমাণবিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে) ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এই ধারণার ওপর যে, তারা নিজেদের বিপদে ফেলেও তা করতে পারবে। যদি সেই প্রতিশ্রুতির অর্থ সিয়াটল বা শিকাগোর আকাশে পারমাণবিক অগ্নিবর্ষণের ঝুঁকি এখন বাস্তবতায় রূপ নেয়, তাহলে ওয়ারশ বা টোকিওর মিত্রদের কাছে এটি কতটুকু নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়? কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা, একবার প্রশ্নের মুখে পড়লে, তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। বুরেভেস্তনিক রাশিয়ার বৃহত্তর কৌশলের প্রতীক ও এক অসামান্য উদ্ভাবন। মস্কো জানে, আকাশে বা সমুদ্রে আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। তাই তারা বিনিয়োগ করছে এমন প্রযুক্তিতে, যা পুরো খেলা বদলে দেয়। তবে পশ্চিমা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা রাশিয়ার কাছে এটি দ্রুত প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার শর্টকাট, ‘আমরা এখনো তোমাকে ভয় দেখাতে পারি’। আর পুতিন জানেন, ভয়-ক্ষমতার সবচেয়ে সস্তা রূপ।

ওয়াশিংটনের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো, সঠিক সামঞ্জস্য না আতঙ্কের সঙ্গে সাড়া দেবে? পারমাণবিক আধুনিকীকরণ ত্বরান্বিত করা যেমন নতুন বোমারু বিমান, ডুবোজাহাজ, আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল আধুনিকীকরণ। তবে এটি যৌক্তিক মনে হলেও, এতে মস্কো যা চায় ঠিক সেটি ঘটার ঝুঁকি থাকে। তা হলো, আরেকটি ব্যয়বহুল অস্ত্র প্রতিযোগিতা যা পশ্চিমা অর্থনীতিকে নিঃশেষ করবে এবং রাশিয়ায় জাতীয়তাবাদী সংকল্পকে শক্তিশালী করবে। কিছু আমেরিকান কৌশলবিদ, ক্রুজ মিসাইল নিষ্ক্রিয় করতে লেজার নির্দেশিত ব্যবস্থায় বিনিয়োগের পরামর্শ দেন। কিন্তু সেই প্রযুক্তি এখনো বেশিরভাগই পরীক্ষামূলক এবং সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেই।  অবশেষে প্রয়োজন সেই পুরনো সমাধান, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ। যখন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না, তখন সংযমই সেরা প্রতিরক্ষা। বুরেভেস্তনিকের উড্ডয়ন হয়তো কৌশলগত আত্মতুষ্টির মৃত্যুবার্তা, কিন্তু এটি কূটনীতির পুনর্জাগরণও বটে। এর প্রভাব শুধু পশ্চিমে নয়, গ্লোবাল সাউথ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। মস্কোর বার্তাটি সবার জন্য পশ্চিমের নিরাপত্তা ভ্রান্ত। উত্তর কোরিয়া তা মনোযোগ দিয়ে দেখবে, চীনও হয়তো শিগগির অনুসরণ করবে। বিশ^ যদি পারমাণবিক শতাব্দীতে প্রবেশ করে, যেখানে ডানায় ডানায় চুল্লি এবং অদৃশ্য প্রতিরোধের রেখায় পরিপূর্ণ তাহলে অন্ধ প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে শুধু যুক্তিই হতে পারে, একমাত্র অবশিষ্ট বিশ্বস্ত প্রতিরক্ষা। এখন দেখার পালা কী হবে নিকট ভবিষ্যতে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত