তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আনা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত আপিলের ওপর অষ্টম কার্যদিবসে শুনানি শুরু করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত সাত বিচারকের আপিল বিভাগে এ শুনানি হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শুনানির একপর্যায়ে তিনি বলেন, খায়রুল হকের (সাবেক প্রধান বিচারপতি) রায়টি ছিল বিদ্বেষপ্রসূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত। এ পদ্ধতি বাতিলের পর থেকেই দেশের গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘এ সরকার ব্যবস্থা ফিরলে দেশে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার ফিরবে। গুম, খুনের রাজনীতির অবসান ঘটবে। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে কোনো লেবাস আমরা চাই না।’
শুনানিতে তিনি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে দ-বিধি অনুযায়ী বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত বলে অভিমত দেন। আজ বৃহস্পতিবার আবারও শুনানি করবেন অ্যাটর্নি জেনারেল। গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে শুনানি শেষ করেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরলেও আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি তারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই চান।
শুনানিতে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আওয়ামী লীগ শাসনামলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের নামে অর্জিত এই দেশের মানুষকে মুক্তির পথ খুঁজতে হয়েছে। গণতন্ত্র খুঁজতে হয়েছে। এখনো খুঁজতে হচ্ছে। যখন মানুষ গণতন্ত্রের কথা বলবে তখন ৭০ লাখ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে গায়েবি মামলা হবে। গণতন্ত্রের কথা বললে, আবু সাঈদ, মুগ্ধরা মারা যাবে। গণতন্ত্র মানে দিনের ভোট রাতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার করে দেওয়া।’ তিনি বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র চাই। মানুষের ভোটের অধিকার ফিরে পেতে চাই। গণতন্ত্রের নামে কোনো লেবাস আমরা চাই না।’
তিনি বলেন, “ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলায় খায়রুল হকসহ যে চারজন সংক্ষিপ্ত রায় দিলেন, সেটা ছিল উন্মুক্ত আদালতে। যেখানে আরও দুটি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল। একটা রায় পরিবর্তন করতে হয় ‘সাবজেক্ট টু ল’তে। রায় যেটা বললেন, সেটা পরিবর্তন করতে হলে রিভিউ করতে হবে। আদালত সুয়োমোটো (স্বতঃপ্রণোদিত) করতে পারেন কিন্তু খায়রুল হক সে পথে না গিয়ে যে পথে হেঁটেছেন সেটি আইনের ব্যত্যয়।’ তিনি বলেন, ‘এটি দ-বিধির ২১৯ ধারার একটি অপরাধ কেননা তিনি পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে এটা জানতেন যে, এ রায় পরিবর্তন আইনের সম্ভব নয় এবং তিনি এটা করেছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে।’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘কথায় আছে হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের রায়ে খায়রুল হক হুকুমটাই নাড়িয়ে দিয়েছেন। এ রায়টি বিদ্বেষপ্রসূত ও প্রতিহিংসাবশত।’
আগামী নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনে চাইলেন বিএনপির আইনজীবীরা : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার শুনানিতে এ ব্যবস্থার পক্ষে আরজি জানিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীরা। তবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই আয়োজন চান তারা। গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল। এর আগের দিন শুনানি করেছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। গতকাল শুনানির বরাতে রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “রাষ্ট্রের নাগরিকের মালিকানা নির্ধারিত হয় ভোটের মাধ্যমে। একজন বিচারপতি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘যারা ভোট দেন তারা ট্যাক্স দেন এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হয় ট্যাক্সের টাকায়। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকানায় তাদের কোনো অংশীদারত্ব থাকে না’। আমি আদালতকে বলেছি যে, এই অংশীদারত্ব প্রমাণের একমাত্র মাধ্যম ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করা।” তিনি বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আমাদের মৌলিক দাবি। আর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, গণতন্ত্রকে সমুন্নত করার জন্য। কিন্তু খায়রুল হক মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলে, এই অজুহাতে যে সংশোধনীটা (ত্রয়োদশ সংশোধনী) বাতিল করেছেন সেটি পুনর্বিবেচনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরিয়ে আনার আরজি জানিয়েছি।’ ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আদালতকে বলেছি, অতীতের নজির অনুযায়ী বাংলাদেশের যেকোনো আইন বা রায় সবসময় পরবর্তী সময় থেকে কার্যকর হয়। আদালতকে বলেছি, আপনারা (আদালত) যে রায়ই দেবেন না কেন, তা যেন পরবর্তী সময় থেকে কার্যকর হয়।’ তিনি বলেন, ‘আগামী মধ্য ফেব্রুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে এ নির্বাচন হবে এমনটা আমি মনে করি না। আদালতের যে রায়, যেটা আমি বলেছি পরবর্তী নির্বাচন, সুতরাং এ নির্বাচনের পরবর্তী থেকে এ বিধানটি কার্যকর হবে এমনটিই আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছি।’
১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে তখনকার বিএনপি সরকার। এ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদনের পর ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা রায় দেয় হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল বিভাগে আপিল করে রিটকারীপক্ষ। ২০১০ সালের ১০ মে আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় তখনকার প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ। গত ২৫ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষে বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন। এরপর পৃথক সময়ে একই বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়।
