মাশরুম চাষে আশা দেখাচ্ছেন রাকিব

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৫৫ এএম

তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে চায়। তেমনি এক স্বপ্নবাজ তরুণ রাকিব তালুকদার।

শৈশব থেকেই রাকিব চরম বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছেন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে শৈশবেই পড়াশোনার ইতি টানেন। দীর্ঘদিন থেকেছেন গার্মেন্টস কারখানায়। অতি কষ্টে জীবন চললেও সেখানে ছিল না স্বাধীনতা। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও জীবন চালানো ছিল কঠিন। উপরন্তু করোনার প্রভাবে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে যায় তিনি। করোনার ভয়াল থাবায় এলোমেলো হয়ে যায় তার জীবন। করোনার আকস্মিক আঘাতে দিশেহারা হয়ে কী করবেন ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না।

এমন দুঃসময়ে একটি ইউটিউব ভিডিও তার ভাবনায় আশার সঞ্চার করে। তিনি মাশরুম চাষ নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি দেখেন। ভিডিওটি দেখে বুঝতে পারেন মাশরুম চাষ করেও স্বচ্ছল হওয়া সম্ভব। এই ভিডিওটি তাকে বেশ আশাবাদী করে। তিনি মাশরুম চাষ করার মনস্থ করেন। কিন্তু শুরু করা বললেই তো শুরু করা যায় না। পূর্ণ প্রস্তুতির জন্য এরপর তিনি মাশরুম ও মাশরুম চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন এবং বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাশরুম চাষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান শুরু করেন, মুসাফির মাশরুম সেন্টার।

লালমাটি সমৃদ্ধ মধুপুর উপজেলার নিজ বাড়িতে মাত্র ৬০০টি মাশরুম সিলিন্ডার দিয়ে রাকিব শুরু করেন মাশরুম চাষ। প্রথম ধাপেই অভূতপূর্ব সাফল্য তাকে আশাবাদী করে এবং আত্মবিশ্বাস জোগাতে সহায়তা করে। সেই থেকে শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এরপর বাড়ির পেছনে একটি শেড তৈরি করেন এবং সেখানেই শুভ্র ফুল ফোটাতে থাকেন। সময়ের পরিক্রমায় রাকিবের এখন আরেকটি সেড হয়েছেন। বেড়েছে কাজের বিস্তৃতি ও চাপ। তিনি এই ব্যস্ততা হাসিমুখে উপভোগ করেন কারণ এই ব্যস্ততা তাকে দিয়েছে স্বচ্ছলতা। এখন তিনি প্রতি মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার মাশরুম বিক্রি করেন।

রাকিব তালুকদার জানান, মাশরুম হচ্ছে সুপার ফুড। যা এক সময় অনেকেই ব্যাঙের ছাতা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। তবে আশার কথা, এই প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন উভয় মার্কেট প্লেসে মাশরুমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সারা দিন কাজ করার পর যখন দেখি, পলি ব্যাগে মোড়ানো মাশরুম সিলিন্ডার থেকে মাশরুম উঁকি দিচ্ছে তখন মনটা ভরে যায়। মাশরুম চাষে আলাদা জমি কিংবা সার-কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। ঘরের কোণে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে পরম যত্নে বেড়ে উঠে মাশরুম।

রাকিবের সাফল্যের সাথি হচ্ছেন অনেকেই। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় দিন দিন মধুপুরে জনপ্রিয় হচ্ছে ঔষধিগুণ সম্পন্ন মাশরুম। বর্তমানে মাশরুম চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে অনেক তরুণ-তরুণীরা। বেশ দূরদূরান্ত থেকে প্রতিদিন মুসাফির মাশরুম সেন্টারে আসছেন মাশরুম চাষে আগ্রহীরা। ধানের খড়, কাঠের গুঁড়া, গমের ভুসি, ধানের তুষ ও পানি মিশিয়ে তৈরি করেন মাশরুম চাষের উপযোগী পরিবেশ। তারপর দীর্ঘ সময় জীবাণুমুক্ত করে রাখা হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঠান্ডা কক্ষে । ২৮ থেকে ৩৫ দিন পর প্রস্তুত হয় মাশরুম উৎপাদনের স্পন প্যাকেট ( সিলিন্ডার)। সেখান থেকেই জন্ম নেয় সুপারফুড খ্যাত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মাশরুম।

মাশরুম নিয়ে রাকিবের রয়েছে সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা। তিনি জানান, ভবিষ্যতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সমাজের তরুণ-যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে কাজ করবেন।

মাশরুম একটি ঔষধি গুণসম্পন্ন ছত্রাক। এতে রয়েছে উন্নতমানের প্রোটিন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও এন্টিঅক্সিডেন্ট, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগ প্রতিরোধ করে। মাশরুম চাষ শুরু নিজের স্বচ্ছলতাই আনে না, বরং সমাজকে নিরোগ ও সুস্থ রাখতেও ভূমিকা রাখে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত