বাংলাদেশের নিত্যপণ্য বাজার এক অদৃশ্য আগুনে পুড়ছে। প্রতিদিন মানুষ যা দেখছে, তা শুধু পণ্যের দাম নয়একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, ডিম কিংবা সবজি সব কিছুর দাম এমনভাবে বেড়েছে যে, সাধারণ মানুষ আর হিসাব মেলাতে পারছে না। বেতন বাড়েনি, আয় কমেছে। কিন্তু খরচের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে প্রতিদিন। এ বাস্তবতা শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়; এখানে মুদ্রাস্ফীতিই জীবনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির অদৃশ্য শত্রু : মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ১০০ টাকায় গত বছর যা কেনা যেত, এ বছর তা হয়তো ১২০ বা ১৩০ টাকায়ও সম্ভব নয়। এভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে আসে, যদিও আয় একই থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৬ শতাংশ, বিশেষত খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৬৪ শতাংশ। এ অস্থিরতা কেবল বাজারের অস্থিরতা নয়; এটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, ডলার সংকট ও আমদানিনির্ভরতা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশ্ববাজারে যুদ্ধ, জলবায়ু ও সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয় যেমন একটি কারণ, তেমনি দেশীয় বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সমানভাবে দায়ী। এই পরিস্থিতিতে সরকার যদিও টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে কিছু পণ্য সরবরাহ করছে, তবুও তা সমস্যার সামান্য অংশকেই ছুঁতে পারে। কারণ, পুরো অর্থনীতিই এখন এক প্রকার ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’-এর মধ্যে আছে অর্থাৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। কৃষক বেশি দামে সার, বীজ ও শ্রম কিনছে, ফলে বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
সীমাবদ্ধতা ও সরকারি সহায়তার অপর্যাপ্ততা : এই পরিস্থিতিতে সরকার যদিও টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে কিছু নিত্যপণ্য সরবরাহ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের একটি অংশকে সামান্য স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবু এ উদ্যোগ সমস্যার সামান্য অংশকে ছুঁতে পারে। জুলাই ২০২৫-এ খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৫৬ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষকে প্রতিদিনের বাজারে অতিরিক্ত চাপ দিচ্ছে। প্রথমত, টিসিবির পণ্যের পরিমাণ ও পরিধি সীমিত। যে সংখ্যক মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে, সেই তুলনায় কার্ডের মাধ্যমে বা খোলাবাজারে দেওয়া পণ্যের সরবরাহ অপ্রতুল। ফলে অধিকাংশ মানুষই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, বিতরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। কার্ড বিতরণে অনিয়ম, কালোবাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়ে যাওয়া এবং ওজনে কম দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো এই মানবিক উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। সঠিক উপায়ে, সময়মতো এবং ন্যায্য ওজনের পণ্য প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, পুরো অর্থনীতিই এখন এক প্রকার ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’-এর মধ্যে আছে অর্থাৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। কৃষক বেশি দামে সার, বীজ ও শ্রম কিনছে, ফলে বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সুদের হার সমন্বয়, ডলার রেটের নমনীয়তা এবং আমদানি ব্যয়ের পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই নীতি পদক্ষেপগুলো বাজারে বাস্তব প্রভাব ফেলতে সময় নেয়। এর মধ্যে ব্যবসায়ী কারসাজি, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা পুরো প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জনজীবনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ : মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও। বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি ৮.৩৬ শতাংশ, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি চাপ তৈরি করছে। মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ে, সমাজে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা তত বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, আত্মহত্যা বা পারিবারিক বিরোধ বৃদ্ধির পেছনেও এই অর্থনৈতিক চাপ কাজ করছে। একসময় যারা মধ্যবিত্ত হিসেবে সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখত, তারাই আজ টিকে থাকার সংগ্রামে নেমে পড়েছে। মধ্যবিত্ত সমাজই দেশের নৈতিক ও শিক্ষিত শ্রেণির ভিত্তি। কিন্তু এই শ্রেণি যদি অর্থনৈতিক চাপে ভেঙে পড়ে, তাহলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাই মূল্যস্ফীতিকে শুধুমাত্র অর্থনীতির সূচক হিসেবে দেখা বিপজ্জনক; এটি এক সামাজিক সংকটের নাম। অবশ্য, বাংলাদেশ একা নয়। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব মিলিয়ে বিশ্বের অনেক দেশই এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, উন্নত দেশগুলো তাদের জনগণকে নানাভাবে সহায়তা দিতে পারে। বাংলাদেশে সুরক্ষাবলয় এখনো দুর্বল। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন বয়স্ক ভাতা বা ভিজিডি প্রকল্প আছে, কিন্তু তা জনগণের তুলনায় অপ্রতুল ও অনিয়মে জর্জরিত। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি পদক্ষেপ।
দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা : অর্থনীতির পাঠ একটাই যখন জনগণের আয় বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়। তাই মুদ্রাস্ফীতিকে শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে, এটি যেন মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়। আজ যেভাবে বাজারে আগুন, তা শুধু দ্রব্যমূল্যের সংকট নয় এটি আমাদের নীতি, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। মুদ্রাস্ফীতির ফাঁদে আবদ্ধ এই জনজীবন থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে বাস্তব পদক্ষেপে, কেবল ঘোষণায় নয়। পরিশেষে বলা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি যতই দেখানো হোক যদি জনগণের পাতে ভাত না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই নয়। মুদ্রাস্ফীতি কেবল অর্থের হিসাব নয়, এটি মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্ন। এখন সময় এসেছে, নীতিনির্ধারকরা যেন এ সংকটকে রাজনৈতিক নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন বাজারের আগুনে পুড়বে না মানুষের আশা।
লেখক : প্রভাষক ও কলাম লেখক
