জাতীয় স্টেডিয়ামে পাঁচ বছর আগের রাতটা ফিরতে ফিরতেও ফিরল না। বাংলাদেশের জয়ের নায়কও হওয়া হলো না হামজা চৌধুরীর। অতিরিক্ত সময়ে শিশুতোষ হজম করে বাংলাদেশকে আরেকটি আক্ষেপের রাত উপহার দিলেন গোলকিপার মিতুল মারমা। নেপালকে পাঁচ বছর ও ছয় ম্যাচ পর হারানোর সেরা সুযোগ ফসকে গেল মিতুলের নড়বড়ে কিপিংয়ে। ম্যাচটা শেষ হলো ২-২ ড্রয়ে। অথচ জোড়া গোলে হামজা দেখিয়েছিলেন জয়ের স্বপ্ন, যা ছুঁতে পারলে ১৮ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে সঙ্গী হতো বাড়তি আত্মবিশ্বাস।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর। করোনাকালে এক সন্ধ্যায় নেপালকে ২-০ গোলে হারিয়ে বুনো উল্লাসে মেতেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচের পর কে ভেবেছিল এর পরের সময়টায় বাংলাদেশের কাছে নেপাল অজেয় হয়ে থাকবে টানা সাত ম্যাচ! ঠিকই শুনছেন। টানা সাত ম্যাচ নেপালকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। এর মধ্যে হেরেছে দুবার। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যারটা যোগ করে ড্র পাঁচটিতে।
কাবরেরার অদ্ভুত কৌশলে প্রথমার্ধে বাংলাদেশ রূপ নিয়েছিল নির্বিষ ঢোঁড়া সাপে। তার ওপর নেপাল ২৯ মিনিটে লিড নিয়ে নেয় রহিত শ্রেষ্ঠার সুযোগ সন্ধানী গোলে। তাতে ঘরের মাঠে আরেকটি হার চোখ রাঙাতে শুরু করে। তবে বিরতির পর দৃশ্যপট বদলে দেন হামজা চৌধুরী। নিজের সহজাত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পরিচয় শিকেয় তুলে বনে যান পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার। তাতেই জন্ম নেয় এক অসাধারণ গোলের। ঢাকার দর্শক সাক্ষী হয় এক চোখ-ধাঁধানো বাইসাইকেল গোলের। সেই আবেশ কাটতে না কাটতেই ফের আনন্দের উপলক্ষ এনে দেন সেই হামজাই। এবার পানেনকা পেনাল্টিতে শুরুতে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশকে তিনি বসান চালকের আসনে। ৮০ মিনিটে তরুণ কিউবা মিচেলকে অভিষেকের সুযোগ দিয়ে মাঠ ছেড়ে অপেক্ষায় ছিলেন রূপকথার নায়ক হওয়ার। তবে এ যে বাংলাদেশ দল। যাদের শেষ মুহূর্তের গোল খাওয়া একটা সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। হলো সেটাই। যোগ করা সময়ে অনন্ত তামাংয়ের সহজ ফ্লিক কঠিন করে ফসকে গোলে রূপ দিলেন মিতুল। হামজার স্বপ্ন হলো চুরমার।
গত মাসে হংকংয়ের বিপক্ষে ড্র ম্যাচের একাদশে তিন পরিবর্তন করেছিলেন কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। চোটে ছিটকে পড়া শেখ মোরসালিন, ডিফেন্ডার শাকিল আহাদ তপু ও ভ্রমণক্লান্ত শমিত সোমের জায়গায় শুরু করেছিলেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া, ফরোয়ার্ড ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ও সোহেল রানা জুনিয়র। তবে কাবরেরা রাকিবকে তার সহজাত রাইট উইং থেকে খেলান লেফট উইংয়ে। আর বাঁয়ে খেলে অভ্যস্ত ফয়সাল আহমেদ ফাহিমকে নিয়ে যান রাকিবের জায়গা। মাঝমাঠে দুই সোহেল রানাকে দিয়ে শুরু করার যৌক্তিকতায় মেলেনি ম্যাচে। সুবাদে প্রথমার্ধে বাংলাদেশ খেলে উদ্দেশ্যহীন ফুটবল। ২৯ মিনিটে প্রথম সমন্বিত আক্রমণকে গোলে রূপান্তর করে নেপাল। বাঁদিক দিয়ে আক্রমণে উঠে সুমিত শ্রেষ্ঠা কাটব্যাক দেন। বক্সে থাকা বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা বলের নাগাল পাননি। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে রোহিত চাঁদ ডান পায়ের গড়ানো শটে বল জালে জমা করেন। বাংলাদেশ কিপার মিতুল মারমা ডানদিকে ঝাঁপিয়েও পারেননি বল আয়ত্তে নিতে।
বিরতির পর নিভে থাকা জুনিয়র সোহেল রানাকে উঠিয়ে কোচ মাঠে নামান শমিত সোমকে। আর রাকিব ও ফাহিমকে ফেরান নিজ নিজ পজিশনে। তাতেই তৈরি হয় হামজার অসাধারণ গোলের ক্ষেত্র। বাঁদিক থেকে ফাহিমের ক্রস নেপালের এক ডিফেন্ডার ক্লিয়ার করেছিলেন। সেই বল ভলি করে বক্সে ফেরত পাঠান জামাল। আনমার্কড হামজা মুহূর্তে বাইসাইকেল কিকে বোকা বানান নেপাল কিপার কিরণ কুমারকে।
দুই মিনিট পরই পেনাল্টি আদায় করে নেন রাকিব। বক্সের ভেতরে পেছন থেকে বলের দখল নিতে ছুটেছিলেন। তবে সুমন শ্রেষ্ঠার ক্লিয়ারেন্স রাকিবের পায়ে আঘাত হানলে শ্রীলঙ্কান রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। তা থেকে বুদ্ধিদীপ্ত পানেনকায় বাংলাদেশকে লিড এনে দেন হামজা। ম্যাচের ৮০ মিনিটে হালকা চোট পাওয়া হামজাকে তুলে অভিষেকের সুযোগ দেওয়া হয় কিউবার মিচেলকে।
এরপর থেকেই হামজা ও বাংলাদেশের অপেক্ষা ছিল জয় দেখার। অথচ ৫ মিনিট অতিরিক্ত সময়ের
তৃতীয় মিনিটে দিনেশ হানজানের কর্নারে অনন্ত তামাংয়ের ফ্লিক নাগালে পেয়েও রুখতে পারলেন না মিতুল, তার গ্লাভস ফসকে বল জালে জড়ালে আরেকটি আক্ষেপের রাত সঙ্গী করে ঘরে ফেরেন প্রায় ১৫ হাজার ফুটবলপ্রেমী।
