পেঁয়াজ বাজারে অস্থিরতার সমাধান নেই?

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ১২:১৩ এএম

প্রতিবছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যসময় পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিকভাবেই অস্থির থাকে। কারণ এই সময়ে আগের মৌসুমের সংরক্ষিত মজুদ শেষের দিকে চলে আসে। কিন্তু নতুন পেঁয়াজ তখনো মাঠে বেড়ে ওঠে। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবধান বাজার চাহিদায় হঠাৎ চাপ তৈরি করে। চলতি বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। রাজধানীর বাজার মূল্যায়নে দেখা যায়, ৭ নভেম্বর প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টন। কিন্তু সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা ও ফসলোত্তর ক্ষতির কারণে বাস্তবে বাজারে এসেছে, ৩৩ লাখ টন। বাকি প্রায় ১১ লাখ টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে, যা সরাসরি ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ঘাটতি পূরণ করতে গত বছর ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল, যার ওপর বর্তমানে ১০ শতাংশ শুল্ককর প্রযোজ্য। বাজারে পেঁয়াজের অস্থিরতা শুধু উৎপাদনের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সমস্যার মূল আরও গভীরে। কৃষকরা পেঁয়াজ সাধারণত মাচা বা কম উন্নত বায়ুচলাচলযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করেন; ফলে আর্দ্রতা, ফাঙ্গাস, তাপমাত্রা ও বাল্ব পচনের কারণে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ নষ্ট হয়। উৎপাদন কাগজে-কলমে যথেষ্ট হলেও বাস্তবে সরবরাহ তত থাকে না। সঙ্গে যুক্ত আছে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পাইকারি মজুদদার ও সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং ভোক্তাদের অতিরিক্ত আগাম মজুদের প্রবণতা। সব মিলিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, যা দাম বৃদ্ধিকে দ্রুততর করে। অর্থাৎ পেঁয়াজের অস্থিরতার মূল বাধা হলো উৎপাদনের চেয়ে ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি।

দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের পরিমাণ গত কয়েক অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে, ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছিল, সেখানে উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৩ লাখ টনের মতো। পরের বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে চাষের জমি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরে এবং উৎপাদনও সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে হয় প্রায় ৩৬ লাখ টন। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে চাষের জমির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে উন্নীত হয়, ফলে সেই বছরে উৎপাদন উঠে যায় প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ লাখ টনে, যা পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ফলন। চলতি অর্থবছরে সরকার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রায় ৪৭ থেকে ৪৮ লাখ টন। অর্থাৎ জমির পরিমাণ, চাষাবাদের সঠিক প্রযুক্তি এবং কৃষকের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির ফলে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন ক্রমাগত উন্নতির দিকে এগোচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও বিপণন কাঠামোর দুর্বলতা, সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে এই উৎপাদন চেইনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে মাঠে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে সরবরাহ সে অনুপাতে স্থির থাকে না, যা মূল্য অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

পেঁয়াজ মূলত একটি রবি ফসল, যার বপনকাল অক্টোবর থেকে নভেম্বর। স্বাভাবিকভাবে ফসল তোলা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে, তবে আগাম জাতের চাষ ক্রমেই জনপ্রিয়। এগুলোর বাল্ব দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় ডিসেম্বরের শেষ থেকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসে, আর জানুয়ারির প্রথম থেকে মধ্যভাগে সরবরাহ আরও বাড়ে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি পেঁয়াজ ৪, ৫ ও ৬ জাতের ফলন বেশি, সংরক্ষণযোগ্যতা উন্নত এবং বাজারে গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি স্থানীয় তাহেরপুরী, ফরিদপুরী ও নাসিক জাতও আগাম বাজারে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে জানুয়ারির প্রথমার্ধেই নতুন পেঁয়াজ বাজারে প্রবেশ করবে। অতিরিক্ত মজুদ না করে ব্যবহার সংযত রাখলে বাজারে চাপ কমবে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে। উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বড় অংশ সংরক্ষণের অভাবে অপচয় হয়, যা বাজারের সরবরাহ ও দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। গত অর্থবছরে দেশে মোট উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ৪৪.৫ লাখ টন পেঁয়াজ। এর মধ্যে বাজারে এসেছে প্রায় ৩৩ লাখ টন, আর নষ্ট হয়েছে প্রায় ১১ লাখ টন। যা মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ। এই নষ্ট হওয়া অংশ যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যেত, তবে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ বজায় থাকত এবং দাম অস্থির হতো না। তাই শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, ফলনোত্তর সংরক্ষণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা উন্নয়নই বাজার স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে, ভোক্তা স্বস্তিতে থাকবে এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে পেঁয়াজ আংশিকভাবে আমদানিনির্ভর, মোট চাহিদার ২০-২৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আসে। আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে ভারতের রপ্তানি নীতি, স্থানীয় বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। দেশে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় উৎপাদনের বড় অংশ শুরুর দিকে বাজারে আসে, পরে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। পাইকারি স্তরে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। শুল্ককর ও এলসি প্রক্রিয়ার বিলম্ব পণ্য বাজারে পৌঁছাতে ধীরতা সৃষ্টি করে, আর নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ আসার আগে সাপ্লাই গ্যাপ তৈরি হয়। বর্তমান সময়ে এলসি খোলা পেঁয়াজ বাজারে আসতে ১৫-২০ দিন লাগে, তবে মাঠের আগাম পেঁয়াজ আরও ২০-৩০ দিনের মধ্যে বাজারে প্রবেশ করবে। তাই প্রশাসনিক নজরদারি ও পাইকারি পর্যায়ের তদারকি জোরদার করলে অতিরিক্ত আমদানি তৎক্ষণাৎ জরুরি নাও হতে পারে। বাজার স্বাভাবিক রাখতে স্বচ্ছতা, মনিটরিং এবং সময়মতো সিদ্ধান্তই মূল বিষয়।

পেঁয়াজ সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করলে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি উন্নত আগাম জাতের চাষ প্রসারিত হলে সারা বছর সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। বাজার ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট ভাঙা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়মিত মনিটর করা প্রয়োজন, যাতে পাইকারি পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট না তৈরি হয়। চাষি, পাইকার এবং সরকারের সমন্বিত নীতি জরুরি, কারণ খাদ্য নিরাপত্তাকে মুনাফার চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে সাশ্রয়ী ব্যবহার শেখার। যারা মাসে সাধারণত পাঁচ কেজি পেঁয়াজ ব্যবহার করেন, তারা সচেতনভাবে তিন কেজিতে নেমে এলে সাময়িকভাবে চাহিদা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বাজারের চাপ কমবে। আমাদের যদি উৎপাদিত ফসল রক্ষা ও সঠিকভাবে ব্যবহার শিখি, আগামীতে আমদানির দিকে কম নির্ভর করতে হবে।

পেঁয়াজের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা দেয়, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ অব্যবস্থা, বাজার পরিচালনায় দুর্বলতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার অনিয়মের ধারাবাহিক ফল। আমাদের দেশে উৎপাদনের ঘাটতি প্রকৃত সমস্যা নয়, বরং উৎপাদিত পেঁয়াজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারা এবং কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হওয়ায় বাজারে ওঠানামা তৈরি হয়। এখন যদি ফলনোত্তর সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা হয় এবং পাইকারি পর্যায়ে অপব্যবহার ও কারসাজি প্রতিরোধ করা যায়, তবে পেঁয়াজ কেবল দেশের চাহিদাই পূরণ করবে না, ভবিষ্যতে রপ্তানি সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তাই আমদানির দিকে তাকিয়ে থাকা,  স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। চাহিদা, উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং নীতিমালার মধ্যে সুষম সমন্বয় গড়ে তুলতে পারলেই পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল ও টেকসই হবে।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত