বৃন্তি দাশ। অপর্ণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে এসএসসি ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০২২ সালে এইচএসসি পাস করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। পরিবারের সবার চাপও ছিল ওদিকে যাওয়ার। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিত হতে না পেরে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির ফ্যাশন ডিজাইন ও টেকনোলজি বিষয়ে। চার বছরের অনার্স কোর্সের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন বৃন্তি দাশ। অপ্রচলিত একটা বিষয়ে কেন পড়তে এলেন জানতে চাইলে বৃন্তি দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাশনের প্রতি আমার কিছুটা দুর্বলতা ছিল। কিন্তু পরিবারের চাপ ছিল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য। ওখানে ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিত হতে না পারায় এখানে ভর্তি হলাম। কিন্তু ভর্তি হয়ে দেখছি লাভবান হয়েছি। এখানে সব হাতে-কলমে শেখানো হয়। আর পড়ালেখাটা বোরিং না, আনন্দদায়ক। এ ছাড়া এখান থেকে পড়ালেখা শেষ হওয়ার পর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন যেমন আছে, তেমনি ভালো কোনো পোশাকশিল্পে চাকরিও হয়তো পেয়ে যাব।’ এদিকে বৃন্তি দাশের মতো এখন অনেকে এমন কর্মমুখী বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। বর্তমানে বিভিন্ন প্রাইভেট বিবিদ্যালয় ও পাবলিক বিবিদ্যালয়গুলোয় সাধারণ বিষয়গুলোয় শিক্ষার্থীরা ভর্তিতে তেমন আগ্রহী নেই। চট্টগ্রাম বিবিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিবিদ্যালয়ের সর্বশেষ ভর্তি কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের ঝোঁক হলো কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিসহ প্রায়োগিক বিষয়গুলোর প্রতি। বিজ্ঞান ও মানবিকের কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাধারণ বিষয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম। মেধাতালিকার নিচের দিকে যেসব শিক্ষার্থী থাকেন, তারাই এগুলোয় ভর্তি হন।
ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করতে হবে
বর্তমান শিক্ষা কারিকুলাম অনুযায়ী দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। চট্টগ্রামে বিজিএমইএ ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের সবার জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন ক্লাসে যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে তাদেরকে কর্মমুখী শিক্ষায় নিয়ে যেতে হবে। এজন্য কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে আরো গতিশীল হতে হবে এবং তাদের আওতায় এলাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। আর যারা উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে আসবেন, তাদের চাকরির উপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘বর্তমান বি ডেটা এনালাইসিস এক্সপার্ট চায়। আমাদের সব করপোরেট কিংবা শিল্প-কারখানার অফিসগুলোয় ডেটা এনালাইসিসের প্রয়োজন হয়। এজন্য কম্পিউটারের মাইক্রোসফট এক্সেল সম্পর্কে ভালো কাজ জানতে হবে। যিনি এক্সেলের কাজ জানবেন, তিনি একটি ভালো জব পাবেন। অর্থাৎ, শিক্ষা হতে হবে বাস্তবমুখী।’
দক্ষ জনবলের অভাব
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, দেশে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের ওপর কোনো সার্টিফিকেটধারী কর্মী নেই। যারা আছেন, সবাই আগেরজনের কাছ থেকে শেখা। এজন্যই আমরা ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি চিটাগাংয়ে একটি প্রফেশনাল কোর্স চালু করেছিলাম। এতে আমরা অ্যাকাডেমিক, ব্যবহারিক ও ইন্টার্নি জবের ব্যবস্থা করেছিলাম।
শুধু শিপিং সেক্টরেই নয়, বর্তমানে অনেক অফিসে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে পড়ালেখা করে সার্টিফিকেটধারী লোক নেই। অন্য বিভাগের কাউকে দিয়ে এ কাজটি চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই চিত্র ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সেক্টরে।
চাকরিমুখী কোর্সে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন
বর্তমানে একটি তৃতীয় শ্রেণির পদে এসএসসি পাস যোগ্যতার পদে হাজারো মাস্টার্স ডিগ্রিধারী ব্যক্তি চাকরির জন্য আবেদন করছেন। কিন্তু ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর একটি পদের আবেদনে খুব কমসংখ্যক প্রার্থী আবেদন করেন। এ বিষয়ে বলতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহিদ হোসেন শরীফ বলেন, ‘বর্তমানে অনেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু চাকরিনির্ভর পড়ালেখা না থাকায় তারা চাকরি পাচ্ছে না। এজন্য বাজারে কোন ধরনের চাকরির চাহিদা রয়েছে সেই ধরনের বিষয় বা কোর্সগুলোয় পড়ালেখা প্রয়োজন।
