রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৩৯ এএম

দেশে মানুষের জীবন কতটা বঞ্চনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই সত্য আমরা অস্বীকার করলেও বাস্তবতা আমাদের ঋজু করে দেয়। স্বাধীনতার পর অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু রাষ্ট্র তার আসল মালিক ‘জনগণ’কে কী দিয়েছে? তারা ভোটাধিকার হারিয়েছে, মর্যাদা হারিয়েছে, ন্যায়বিচারের আশ^াস পেয়েছে, কিন্তু বিচার নয়, প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। বাস্তবতা নয়, উন্নয়নের ঢাকঢোল পেয়েছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আজও ‘মালিক-প্রজা’র মতো, ‘জনগণের রাষ্ট্র’ নয় কেবল প্রবঞ্চনা। তবু এ দীর্ঘ অন্ধকারের ভেতরেও মানুষ অন্তত একজন রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে শুনেছে তাদের ন্যায্য পাওনা, মর্যাদা, সমান অধিকার, ভোট, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কেউ বঞ্চিত থাকবে না, কেউ নিপীড়িত হবে না, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের এবং জনগণই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বদলেছে, দল পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র যা তাই রয়ে গেছে। এ জন্য তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা এমন রাজনীতি চাই যা ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জনগণের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনে। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারলেই আমি মনে করব, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কিছু অর্জন করেছি।’ আমরা জানি, সে কে?

এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিপর্যস্ত রাষ্ট্রীয় প্রান্তরে দাঁড়িয়ে জনগণের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারে হাত লাগান। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সুযোগ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ তার নেতৃত্বে কাঠামোগতভাবে শুরু হয়। সেই সফলতার মূল্যও তাকে জীবন দিয়ে চুকাতে হয়। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পরে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা পালাক্রমে ক্ষমতায় আসেন। দুজনই অনেক কাজ করেছেন। রাষ্ট্রের কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু দুই দলের অধিকাংশের দুর্নীতি, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা এবং দলীয়করণ রাষ্ট্রকে ডুবিয়েছে, জনগণকে বঞ্চিত করেছে। আর সর্বশেষ, আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে ক্ষমতার এমন এক দানবীয় একচ্ছত্রতা তৈরি হয়েছিল, যার বিবরণ আজ আর গোপন নয়। ভোটাধিকার বিলীন, প্রশাসন দলীয়করণ, বিরোধী দল ও মত দমন, হত্যা, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারব্যবস্থার দুঃসময়, দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তার এবং রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা এসব আজ ইতিহাসের নির্মম নথি। ফলে জনগণ বিশ^াস করতে পারছে না কাউকে। ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতা তাদের অবিশ্বাসী করে তুলছে। কারণ রাষ্ট্র কখনো জনগণের হয়ে কাজ করেনি; বরং জনগণই রাষ্ট্র নামের বৃহৎ কাঠামোর কাছে বারবার প্রতারিত হয়েছে। এমনকি শত শত, হাজার হাজার মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। এ অবস্থায় যিনি নতুন করে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন তার নাম তারেক রহমান। রাজনৈতিক আক্রমণ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, প্রচারযুদ্ধ, মামলা, নির্বাসন, মিথ্যা অপবাদ সবকিছুর পরও তিনি একটি কথাই বারবার উচ্চারণ করে যাচ্ছেন ‘আমি মনে করি, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি তখনই কিছু অর্জন করেছি বলতে পারব, যেদিন বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারব।’ এ বাক্য বাংলাদেশের ৫৪ বছরের দুঃখ, বঞ্চনা, অপমান, অবিশ্বাস, দমন ও আশাহত জনগণের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি। যা তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি। তিনি রাষ্ট্রকে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয় একটি নৈতিক, মানবিক এবং দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান।

তারেক রহমান বলেছেন, ‘পরিপূর্ণ রাজনীতিক সেই, যে নিজের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের মতকে সম্মান জানাতে পারে।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতির মানবিক ভিত্তিকে শক্ত করে। যে সমাজে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা থাকে, সেখানে বিরোধী মতকে দমন নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হয়। গণঅভ্যুত্থানে জনগণের যে আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে তা রাষ্ট্রের বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর দাবি। জনগণ চায় এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, জনগণের। নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, যেখানে ভোট জনগণের হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণই গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারলে গণতন্ত্র অর্থবহ হয়। তারেক রহমান এই সত্যটি উপলব্ধি করেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন গড়ে তুলেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো অসংখ্য ভুল করেছে। কিন্তু তারা কখনই তা স্বীকার করতে চায় না। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলগুলো তাদের ঐতিহাসিক ভুলে অনড় থাকে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাবিদার দলগুলো সরকারে থাকাকালে দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিরোধী দলকে দমন করে। রাষ্ট্রীয় দুর্যোগেও ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। রাজনীতিতে ক্ষমতার আকাক্সক্ষা, জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবহেলা ভুলের রাজনীতির মূল কারণ। নেতারা নিজেদের স্বার্থে দুর্নীতি, অর্থ অপব্যবহার ও বিভাজন সৃষ্টি করেন, যা জনগণের আস্থা কমায়। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থরক্ষা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সহিষ্ণুতা ও গঠনমূলক বিতর্কের অভাবে বিভাজন বাড়ে, যা দেশের সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। এসব ভুলের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি এক অরাজক অবস্থায় আটকে রয়েছে। নতুন প্রজন্ম রাজনীতির জটিলতার চেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সঠিক রাষ্ট্রীয় আচরণ পছন্দ করে। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। বিএনপি তাদের ভুলের রাজনীতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে বলছে অতীতের বিভাজন, বিরোধ ও প্রতিশোধের রাজনীতি শেষ করতে হবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। তারা বিরোধীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে, সহযোগী হিসেবে দেখার আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে মামলার ধারা, দমন-পীড়ন বা শক্তি প্রয়োগের পথ পরিহার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

২ মে ২০২৫, তারেক রহমান বলেছেন, ‘লাখো প্রাণের বিনিময় ১৯৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ, ’৭৫-এর ৭ নভেম্বরের আধিপত্যবিরোধী তাঁবেদার মুক্ত বাংলাদেশ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী বাংলাদেশ এবং ২০২৪-এর ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন প্রতিটি বাঁকে মানুষ কেন অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন? কী ছিল শহীদদের স্বপ্ন? তারা কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য ৫৪ বছর সময় খুব বোধ হয় কম সময় নয়, এ জন্যই আমি মনে করি শুধু শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ শেষ হয়ে যায় না। শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল আমরা তাদের সুমহান আত্মত্যাগের প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ১৯৭১ সাল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের, ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার।’ একজন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মজুর বা চাকরিজীবী সরকারের কাছে যা চায়, তা খুবই সাধারণ ও ন্যায্য। তারা চায়, প্রতিদিনের পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা যেন তাদের পরিবার স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোনসহ সুখেশান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে। তাদের সন্তান যেন স্কুলে ভালোভাবে পড়াশুনা করতে পারে এবং পড়াশুনা শেষে ঘুষ ছাড়াই একটি ভালো চাকরি পায়, হাসপাতালে গেলে উন্নত চিকিৎসা পায় এবং থানায়-পুলিশে, আদালতে ন্যায়বিচার পায়। তারা চায়, সরকার যেন সবার জন্য সমান আইনের ব্যবস্থা করে।

এই চাওয়া মোটেও বড় কিছু নয়, বরং খুবই মৌলিক এবং ন্যায্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ৫৪ বছরে কোনো সরকার এই সামান্য চাওয়াটুকু পূর্ণ করতে পারেনি। রাজনীতি যদি মানবকল্যাণের হাতিয়ার না হয়, তা কেবল ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘মানুষের হৃদয়ে জায়গা না করে যে রাজনীতি টিকে থাকতে চায়, তা একসময় শূন্যতায় বিলীন হয়।’ জনগণের আস্থা অর্জনই রাজনীতির আসল সাফল্য। বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে মানুষ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বারবার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ফিরে এসেছে প্রতারণা। রাষ্ট্র তাদের কাছে অপরিচিত এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষের কান্না শোনা যায় না। এমন সময়ে তারেক রহমানের দর্শন, সংগ্রাম ও অঙ্গীকার মানুষের কাছে এক নতুন দিশা তৈরি করেছে। কারণ তার দর্শন হলো রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। তার রাজনীতি ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়; মর্যাদা পুনরুদ্ধারের রাজনীতি। তার সংগ্রাম কোনো দলের জন্য নয়; জনগণের জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তার নিজের দলের মধ্যে থাকা দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মী। তিনি আর কত বহিষ্কার করবেন, সতর্ক করবেন! এ দেশ বহু প্রতিশ্রুতি শুনেছে, বহু স্বপ্ন দেখেছে, বহু হতাশা পেয়েছে। মানুষ ক্লান্ত। রাজনীতি ক্লান্ত। কিন্তু আশার কথা হলো, একজন নেতা এখনো আছেন যিনি স্পষ্ট বলেছেন যে, রাজনীতি মানে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম শর্ত। তার কথা, কাজ, দর্শন ও সংগ্রামে জনগণের প্রতি যে দায়বদ্ধতা প্রকাশিত হয়েছে তা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত। তার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নেবে কি না,  তা নির্ভর করবে জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর, সংগ্রামের ওপর এবং রাষ্ট্রকে পুনরায় নিজেদের করে নেওয়ার সাহসের ওপর। ইতিহাস বলছে জনগণের স্বপ্ন একদিন বাস্তব হয়। আর তারেক রহমান সেই স্বপ্নের ভাষাই আজ দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত