চট্টগ্রামের ‘দেয়াঙ’ শব্দটি সম্ভবত লৌকিক। এর অর্থ বাংলা একাডেমির বাংলাদেশের আঞ্চলিক শব্দের অভিধানেও খুঁজে পাওয়া যায়নি! তাই আমার অবোধ্য এই শব্দটি। ‘দেয়াঙ’ একটি লিটলম্যাগের নাম। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা থেকে অনিয়মতভাবে প্রকাশিত হয় এই ছোট কাগজটি। এর সম্পাদক মাহমুদ নোমান। তিনি সংস্কৃতিমনস্ক এবং বাংলাদেশ ও বাঙালির ঐতিহ্যে নিবেদিতপ্রাণ তরুণ। তারুণ্যের অসাধ্য সাধনের চেতনা না- থাকলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ কেউ তাড়ায় না! পচনধরা তারুণ্যের এই দুঃসময়ে জুতার তলা ক্ষয় করে এমন অলাভজনক কর্মে কেউ যায় না। এই বিবেচনায় নোমান কেবল ধন্যবাদার্হ নন, শ্রদ্ধেয়ও। রাজধানী নয়, মেট্রোপলিটন নগরী নয়, জেলা শহরও নয়; দক্ষিণবঙ্গের একটি উপজেলা সদর থেকে এমন ঐতিহ্যমণ্ডিত সাহিত্যপত্রের প্রকাশ কেবল দুঃসাহসিক নয়রীতিমতো অসাধ্যসাধন।
এসব বলছি ভেবেচিন্তে। লেখা না হয় দ্বারে দ্বারে ঘুরে, চেয়েচিন্তে, তাগিদ দিয়ে, ধর্না দিয়ে সংগ্রহ করা গেল কিন্তু কাগজ-মুদ্রণ-প্রচ্ছদ-বাঁধাইএসবের খরচ! বিজ্ঞাপন তো এমন কাগজের জন্য সোনার হরিণ। করপোরেট বাণিজ্যের বিজ্ঞাপন এখন বড় প্রিন্টমিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার করায়ত্ত। তেলা মাথায় তেল ঢেলে পারস্পরিক লাভই করপোরেট বাণিজ্যের উদ্দেশ্য। ন্যাড়া মাথায় কেউ তেল ঢালে না, জট মাথায় তো নয়ই! তাই শেষ উপায় নিজের পকেট, ঋণ এবং ভিক্ষা। তাতেও না কুলালে অবশেষে বাকি-বকেয়া। লিটলম্যাগের এই বিধিলিপি বলেই জন্মের পর সাবালক হতে না হতেই তার অনিবার্য অপমৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশের সব ছোট কাগজের নিয়তি একই রকম।
মাহমুদ নোমানের ‘দেয়াঙ’ ছোট কাগজ হিসেবে বিশিষ্টতার দাবিদার। কিছু গল্প-কবিতা, প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা জড়ো করে তিনি পত্রিকাটি সাজাননি। যে দুটি সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তা বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যা। প্রথম সংখ্যার বিষয় ধান, পরেরটি মাছ। পরবর্তী সংখ্যার বিষয় তিনি নির্ধারণ করেছেন বুনোফুল। একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, বাঙালির প্রিয় খাদ্য ও আনন্দ-আয়োজনের বিষয় তিনি অন্বেষণ করতে চেয়েছেন। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত যে বলেছেন, ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা, খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি/ জোটো যদি দুইটি পয়সা, ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী’বাঙালির চরিত্র সম্পর্কে এমন বাণীর কথা মনে পড়ে যায়। বিষয়ভিত্তিক লেখা সংগ্রহ করা চাট্টিখানি কথা নয়! সব লেখকের তেমন প্রস্তুতি, সাধ্য এবং ইচ্ছে থাকে না। সম্পাদকের চাপের মুখে অনেকে অনুরোধে ঢেঁকি গেলেন। তাতে হয়তো দায়সারা লেখা মিলে কিন্তু তা দিয়ে পত্রিকার পাতা ভরলেও সম্পাদক ও পাঠকের মন ভরে না! এত সব বাধা অতিক্রম করে যে মাহমুদ নোমান দুটি বিশেষ সংখ্যা বের করতে পেরেছেন তাতে তিনি শুধু ধন্যবাদার্হ নন, শ্রদ্ধার্হও।
তেরোটি প্রবন্ধ, ঊনত্রিশটি জেলাভিত্তিক স্মৃতিচারণ, সতেরোটি কবিতা, পাঁচটি আঞ্চলিক স্মৃতিকথা ও একটি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘দেয়াঙ’-এর মাছ সংখ্যা ২৫৬ পৃষ্ঠার স্বাস্থ্যবান সংকলন। তবে জেলাভিত্তিক লেখাগুলো প্রায় সবই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণমূলক। তাতে বৈচিত্র্য কম। অধিকাংশ প্রবন্ধে গভীরতা ও বিস্তৃতি লক্ষ্যযোগ্য নয়। তবু বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে একটি ধারণা মিলে এই বিশেষ সংখ্যা থেকে। গবেষক তো বটেই, সাধারণ পাঠকের জন্যও এই সংখ্যাটি সংগ্রহে রাখার মতো। বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যার কথা মনে হলেই মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার ভেতরে-বাইরে ঋদ্ধ ঢাউস সংখ্যাগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে শিহাব শাহরিয়ারের বৈঠার বিষয়ভিত্তিক প্রকাশনাগুলোর কথা। এই কাফেলায় সম্প্রতি ‘ভাত সংখ্যা’ নিয়ে যুক্ত হয়েছেন আজাদ বুলবুল। এই সংস্কৃতি সাধনার মিছিলে মাহমুদ নোমানকে স্বাগত জানাই। তার কণ্ঠেও শুনতে চাই রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী‘আমি তোমার যাত্রীদলের রব পিছে/ স্থান দিও গো আমায় তুমি সবার নিচে।’
