প্রবহমান সময়ে সতর্কতার সঙ্গে...

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:০৮ এএম

কোনো কিছু হঠাৎ করে ঘটে না। যদিও তেমনটি মনে হয় জনাব শরীফ শামসের কাছে। শরীফ শামস আলাদা বিশেষ কোনো ব্যক্তি নন। নন কেউকেটা কোটাধারী কেউ। তিনি নিজেকে সবজান্তা মনে করলেও ব্যাপারটি অন্যের কাছে বড় একটা কিছু নয়। অতিসাধারণ পর্যায় থেকে উঠে আসা শরীফ শামস, নিজেকে অসাধারণদের ক্লাবে প্রবেশ করার টিকিট এখনো পাননি। তবে তার আশা আছে। ধরা যাক, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা জনাব শরীফ শামসের মতো। দেখলে মনে হবে, তার ভেতর জ¦লছে পুড়ছে, কিন্তু তিনি নিজেকে বাইরে স্মার্ট দেখানোয় ব্যতিব্যস্ত। অনেক অমূলক প্রশ্নে, তার কাছ থেকে সদুত্তর মেলে না। মিলবে না জেনেও, তাকে প্রশ্নবাণে বিব্রত করাই সার হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতি, রাজনৈতিক অভিলাষের কাছে পরাভূত, পরাস্ত। এমন কি পর্যুদস্ত । ঘরে ঘরে সব কাজ, ধ্যান ও পাবলিক সার্ভিসে রাজনৈতিক উৎকোচ বেড়ে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রতিশব্দ ‘রাজনৈতিক বিজ্ঞান’ না হয়ে ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানে’ পরিবর্তিত হয়েছে সুকৌশলে। রাষ্ট্র একটা অবিভাজ্য অবিনশ্বর সত্তা। রাষ্ট্রকে সরকার এবং সরকারকে রাষ্ট্র গিলে খাওয়ার প্রবণতায় দলীয় তথা সরকারিকরণ করতে গিয়ে, আম-ছালা দুটোই যাওয়ার জোগাড়। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাস্থ্য উচ্চমাত্রায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলা যায়। ডায়াবেটিস নিজে নামি-দামি কোনো রোগ নয়।

ডায়াবেটিস মানবদেহে অনেকগুলো রোগের আহ্বায়ক সমিতির সভাপতি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নানা ব্যাধি বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আধুনিক গবেষকরা যাকে বলে থাকেন ‘চ্যালেঞ্জ’।

আগে একজন ডাক্তার অনেক রোগের চিকিৎসা করতেন। এখন প্রায় প্রতিটা রোগের জন্য আলাদা-আলাদা বিভাগ বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। রোগ নির্ণয়ের জন্য গড়ে উঠেছে হরেক রকম ডায়াগনস্টিক ক্লিনিক। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও ঐকমত্যের রাজনীতি এখন অগণিত বহিরাগত বিশেষজ্ঞের (আমজনতার সঙ্গে যাদের কোনো সংযোগ নেই) খপ্পরে। তারা শুধু থিওরি আওড়ান। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বলিষ্ঠ উচ্চারণে বিদেশি ভাষায় আমজনতার ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কথা বলেন। এ বাতচিতে তাদের নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটে বটে। কিন্তু আমজনতার সার্বিক কোনো উন্নতি দৃশ্যগোচর হয় না। চিকিৎসা ক্ষেত্রে গুগল ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ছে, চ্যাটজিপিটি দিয়ে সৃজনশীল রচনার রূপান্তর চলছে, সুকুমার ভাব ভাবনারা  মাঠে মারা যাচ্ছে, এমন কি রোগীদের প্রেসক্রিপশনও রচিত হচ্ছে সিমুলেশনে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) দ্বারা মন ও শরীরের  ব্যবচ্ছেদ চলছে। অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এখন এমনকি উন্নয়ন ও ঐকমত্যের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর) বলবৎ হতে চলেছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। মশহুর শহরের বাসা-কলোনিতে বার্ষিক ঈদ মিলনমেলা। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। অ্যাপার্টমেন্ট সমিতির কার্যনির্বাহী পর্ষদের মহিলা কর্মকর্তা স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছেলেমেয়েদের একটি নাটিকা উপহার দেওয়ার জন্য তালিম দিচ্ছেন। প্রস্তুতি শেষ।

 

নাটিকার কাহিনিটি বেশ চমকপ্রদ-আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ডিজিটাল যুগে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে কীভাবে পড়াশোনা ও ইন্টার্নশিপ করছে, তা তুলে ধরাই এই নাটিকার উদ্দেশ্য। নাটকটি শুরু এভাবে হাসপাতালের সার্জিকেল অপারেশন টেবিলে রোগী শোয়া, তার একটা অপারেশন হবে। কোনো লাইট নেই,  মোবাইল ফোনের ফ্লাশ লাইট রোগীর শরীরে প্রক্ষেপিত। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এলেন। সঙ্গে ২ জন প্রশিক্ষণার্থী ইন্টার্নি ডাক্তার, এদের একজন অর্সি । সার্জন বললেন, রোগীর কিডনি অপসারণ করা হবে। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট পদ্ধতিটা কী,  তিনি অর্সিকে গুগল সার্চ করে জানতে বললেন। অর্সি বলল, স্যার বিদ্যুৎ না থাকায় কানেকশন নেই। আর  নেই ওয়াইফাই। তাই সার্চ দেওয়া যাচ্ছে না। রোগী এ ধরনের আলাপ শুনে বলল, আমার কিডনির অসুখ না। আমার গলব্লাডার রিমুভ করার জন্য, এখানে আনা হয়েছে। ডাক্তার বললেন, রোগীর অ্যানেসথেসিয়া প্রসিডিউর ঠিকমতো কাজ করছে না মনে হচ্ছে। রোগী কথা বলছে কীভাবে? তিনি অন্য ইন্টার্নিকে সাজেস্ট করলেন।  রোগীর এই অবস্থাটি আইএমওর মাধ্যমে, নিঝুম দ্বীপে ভ্রমণরত চিফ অ্যানেসথিওলজিস্টকে পাঠানো হোক। সঙ্গে সঙ্গে তা পরিপালিত হলো। স্যাটেলাইট কানেকশন কাজ না করায় ভিডিওটি যেতে বিলম্ব হলো। গুগলে সার্স চলতে থাকল। রোগীকে অধৈর্য না হতে কাউন্সিলিং করতে এলো নেফ্রোলজির আরেক ডাক্তার।  যার মেডিকেলে পড়ার সময় মেজর ছিল ফুট কেয়ার। ডাক্তাররা যখন কিডনি গুগল অ্যানেসথেসিয়া নিয়ে আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত, তখন রোগী বলল তার মনে পড়ছে তার একটি কিডনি অনেক আগেই তার স্ত্রীকে দেওয়া হয়েছিল। সবেমাত্র একটি কিডনি আছে। তখন পাশের ওয়ার্ডবয় বলল, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যানটেশন তো হচ্ছে না। আপনার কিডনি রিমুভ করা হবে, এতে গলব্লাডার  সমস্যার সমাধান হবে।

সার্জন জানতে চাইলেন, গুগলে এমন নির্দেশনা থাকলে তাহলে আমরা দেরি করছি কেন। নিউরোসার্জন বললেন যা-ই করি, কিডনি কমিটির সম্মতি প্রয়োজন। কিডনি কমিটি আবার কী? নিউরো সার্জন জানালেন, একজন অচিকিৎসক ডক্টর, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা এবং একজন সর্ববিদ্যাবিশারদ (হিসাব-প্রশাসন-চিকিৎসা এমনকি রন্ধন প্রণালি-পাচক পরীবিক্ষক) এ কমিটির সদস্য। অর্সি জানাল, গুগলে এ কমিটির কর্মপরিধি জানতে চেয়ে সার্চ দেব স্যার? ওয়াইফাই এসেছে? জি স্যার। রোগী বলল, আমাকে মুক্তি দিন। প্রয়োজনে আমার পাসপোর্ট রেখে দিয়ে, মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিন। কিছুদিন আগে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। সেখানেও আমি এমন মানসিক যন্ত্রণা প্রদায়ক ব্যবহার পাইনি। বাইরে আমার অ্যাটেনডেন্ট আছেন, তাকে ডাকেন। এসব শুনে সার্জন ভ্রু কুচকে স্বগতোক্তি করলেন গুগলে কি এ ধরনের সাইক্রিয়াটিক রোগীর বচন সম্পর্কে কোনো এত্তেলা পাওয়া যাবে? আমাদের সিলেবাসে ছিল না। কেন না তখনো জঙ্গি কর্মকা- কারিকুলামভুক্ত ছিল না। এ ধরনের আচরণ সংবলিত রোগীকে মনে হচ্ছে লোকটি জঙ্গি গ্রুপের সদস্য। এর কিডনি অপসারণ করে আবার না কোনো গোয়েন্দা সংস্থার জেরার সম্মুখীন হতে হবে। অর্সি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, সার্জন বললেন থ্যাঙ্কস ‘গুগল ডাক্তার’। অর্সি লজ্জা পেল মনে হলো, ‘আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমার জীবনে এই প্রথম ছুরি কাস্তে নিয়ে অপারেশনে গিয়েও থামতে বাধ্য হলাম। জঙ্গি অপারেশনে যাওয়াটা আমাদের পেশায় পড়ে না। কেউ যদি জানতে পারেন হাসপাতালের এই রোগী, স্বয়ং শরীফ শামস!

আসলে এটা বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রতীকী প্রকাশ। যে আর্থ-সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে শরীফ শামসদের অবস্থা দেখে, সাধারণ একজন দেশবাসীর বলতে ইচ্ছা হতেই পারে ‘আমার বলার কিছু ছিল না’। তবে  সবাইকে এ উপলক্ষে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্য ও অর্থনীতি’ নিয়ে গুগলের নির্বাহী প্রধান সুন্দর পিচাইর সতর্কতার কথা শুনাতে চাই। ‘মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এনেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। নানা জটিল কাজ দ্রুত, দক্ষ ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করে মানুষকে সহায়তা করছে এ প্রযুক্তি। তবে এর সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিও।’ সম্প্রতি গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তথ্যগত ও অর্থনৈতিক, এ আই এর- দুই ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। সুন্দর পিচাইর মতে, যাচাই না করে এআইর তথ্য ব্যবহার করা বড় ধরনের বিভ্রান্তি ও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি, এআইকে কেন্দ্র করে বিশাল বিনিয়োগ ও বাজার-বুম তৈরি হয়েছে। এটি কোনোভাবে ধসে পড়লে বা বুদ্বুদ ফেটে গেলে শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি, বাজার এবং অন্যান্য খাতও।  সুন্দর পিচাই বলেছেন, এআই মডেল যেকোনো তথ্যে ভুল করতে পারে। এগুলো ব্যবহার করার সময় অন্যান্য তথ্যসূত্রের সঙ্গে যাচাই করে ব্যবহার করা জরুরি। তার মতে, এআইর এই সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দিচ্ছে একটি সমৃদ্ধ তথ্যব্যবস্থা থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পিচাই বলেন, এ কারণেই মানুষ গুগল সার্চ করে। গুগলের সঙ্গে আরও অন্যান্য পরিষেবাও রয়েছে, যেগুলো নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করতে সক্ষম। আলাপকালে, সুন্দর পিচাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ‘একটি অসাধারণ মুহূর্ত’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে এআইর উত্থানের মধ্যে কিছু অযৌক্তিকতাও রয়েছে ।

লেখক:অনুচিন্তক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত