সাহাবিদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন যে ফেরেশতা

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৫৪ এএম

ইসলমের শুরুর যুগে একদা নবীজি (সা.)-এর মজলিসে এক অপরিচিত মানুষ আগমন করেন। তার পোশাক অস্বাভাবিকভাবে পরিচ্ছন্ন। চেহারায় ভ্রমণের কোনো ক্লান্তি নেই। অথচ তাকে চেনে না কেউ। সাহাবিদের বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে তিনি এগিয়ে এলেন নবীজির কাছে। শান্ত ভঙ্গিতে বসলেন সামনে। প্রশ্ন করলেন দ্বীনের মূল ভিত্তি নিয়ে। আর প্রতিটি উত্তরে জানালেন সম্মতি। উপস্থিত সাহাবিরা দেখলেন, প্রশ্নোত্তরের সেই মুহূর্তে ধীরে ধীরে ইসলামের সারমর্ম তুলে ধরা হচ্ছে। ইমান, ইসলাম, ইহসান, কেয়ামত, সব শিক্ষাই যেন একত্রে ধরা দিচ্ছে সেই সংলাপে। ঘটনার শেষে নবীজি জানালেন রহস্য। তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন। ছিলেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। এসেছিলেন দ্বীনের মূল শিক্ষা সরাসরি সাহাবিদের সামনে স্পষ্ট করে দিতে। এই অনন্য ঘটনার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইসলামের ভিত্তিমূল বোঝার সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ পদ্ধতি।

ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি আমাদের নিকট আগমন করলেন। ধবধবে সাদা তার পোশাক। চুল তার কুচকুচে কালো। না ছিল তার মধ্যে সফর করে আসার কোনো চিহ্ন, আর না আমাদের কেউ তাকে চিনতে পেরেছেন। তিনি এসেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসে পড়লেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাঁটুর সঙ্গে তার হাঁটু মিলিয়ে দিলেন। তার দুহাত নবীজির দুই উরুর ওপর রেখে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলুন, অর্থাৎ ইসলাম কি?’

উত্তরে তিনি নবীজি (সা.) বললেন, ‘ইসলাম হচ্ছে, তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত আর কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল, নামাজ আদায় করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজান মাসে রোজা পালন করবে এবং বায়তুল্লাহর হজ করবে, যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে।’

আগন্তুক বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’ ওমর (রা.) বলেন, আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম, একদিকে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করলেন, আবার অপরদিকে রাসুল (সা.)-এর বক্তব্যকে (বিজ্ঞের ন্যায়) সঠিক বলে সমর্থনও করলেন।

এরপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে ইমান সম্পর্কে কিছু বলুন।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, ‘ইমান হচ্ছে, মহান আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ এবং পরকালকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এ ছাড়া তকদিরের ওপর বিশ্বাস করা। উত্তর শুনে আগন্তুক বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’

অতঃপর তিনি আবার বললেন, ‘আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তুমি তাকে দেখছ। আর তুমি যদি তাকে নাও দেখ, তিনি তোমাকে অবশ্যই দেখছেন।’

আগন্তুক এবার বললেন, ‘আমাকে কেয়ামত সম্পর্কে বলুন।’ উত্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি প্রশ্নকারীর চেয়ে অধিক কিছু জানেন না।’ আগন্তুক বললেন, ‘তবে কেয়ামতের নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে বলুন।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘কেয়ামতের নিদর্শন হলো, দাসী তার আপন মুনিবকে প্রসব করবে। তুমি আরও দেখতে পাবে, নগ্নপায়ী বিবস্ত্র হতদরিদ্র মেষচালকেরা বড় বড় দালান-কোঠা নিয়ে গর্ব ও অহঙ্কার করবে।’

ওমর (রা.) বলেন, অতঃপর আগন্তুক চলে গেলে আমি কিছুক্ষণ সেখানেই অবস্থান করলাম। পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে ওমর! প্রশ্নকারী আগন্তুককে চিনতে পেরেছ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, ইনি হচ্ছেন জিবরাইল (আ.)। তিনি তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশে এসেছিলেন।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ)

লেখক : আলেমা ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত