ভেনেজুয়েলা ঘিরে নতুন ছক ট্রাম্পের

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৩ এএম

তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ক্যারিবীয় সাগরে কয়েক মাস ধরেই সামরিক মহড়া চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা নিয়ে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী মাদক সরবরাহে জড়িত। ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে ঘোলা হওয়া জল, আরও ঘোলা করেছেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রকাশ্যেই তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মাদক সম্রাট উপাধি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি সরাসরি মাদক চোরাচালানে জড়িত। মাদুরো অবশ্য এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। গতকাল রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত চারজন কর্মকর্তার বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, খুব শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় সংশ্লিষ্ট নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।

তবে নতুন অভিযানের সময় বা পরিসর কেমন হবে, কিংবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা সঠিকভাবে জানতে পারেনি রয়টার্স। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে বলা হচ্ছিল, সামনে কিছু বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পর এই ধারণা আরও প্রবল হয়। এ বিষয়ে জ্ঞাত দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নতুন অভিযানের প্রথম ধাপ হিসেবে গোপন অভিযান শুরুর সম্ভাবনাই বেশি। তবে এই কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে পেন্টাগন। সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। একজন সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা শনিবার বলেন, ভেনেজুয়েলার বিষয়ে এসব সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে ও দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের শক্তি ব্যবহারে প্রস্তুত।

তবে অনেকের মতে, এসব ঘটনার পেছনের ঘটনা হচ্ছে ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভারের দিকে নজর পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর রিপাবলিকান নেতার। মধ্যপ্রাচ্যের সেরা তেলের উৎসগুলো ওয়াশিংটনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় ভেনেজুয়েলাকেই রেসের ঘোড়া হিসেবে দেখছেন ট্রাম্প। তার এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘প্রাচীনপন্থি’ মাদুরোকে সরিয়ে নোবেলজয়ী বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান ট্রাম্পএমন তত্ত্ব এখন আর শুধু কানাঘুষার পর্যায়ে নেই। রয়টার্সকে অন্য দুই কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় থাকা ইস্যুগুলোর মধ্যে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনাও রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মাদুরো বহুবার বলেছেন, ট্রাম্প তাকে সরাতে চান এবং ভেনেজুয়েলার জনগণ ও সেনাবাহিনী এই প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করবে। ভেনেজুয়েলার ইস্পাত কঠিন শাসক হুগো শাভেজের অনুসারী নিকোলাস মাদুরোকেও পছন্দ করেন না ট্রাম্প। বিষয়টি নিয়ে এখন আর কোনো রাখঢাক নেই। তবে তাদের এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব নতুন নয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২১) মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক প্রশাসনকে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করত ওয়াশিংটন। পাশাপাশি, অবৈধ অভিবাসী, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এসব বিষয়ও ট্রাম্পের মাদুরো অ্যালার্জির বড় কারণ।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) প্রধান এয়ারলাইনসগুলোকে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় ‘সম্ভাব্য ঝুঁকি’ নিয়ে সতর্ক করেছে এবং সতর্কতা মেনে চলাচলের নির্দেশ দেয়। এফএএর সতর্কতার পর শনিবার তিনটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস ভেনেজুয়েলা থেকে নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র কার্টেল দে লস সোলেসকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছে। তাদের অভিযোগ, এই সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশ করানোর সঙ্গে জড়িত। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, মাদুরো এই কার্টেলটির নেতৃত্ব দেন। যদিও তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি বলেন, ‘সন্ত্রাসী তকমা’ যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অনেক নতুন বিকল্প উন্মুক্ত করবে। ট্রাম্প বলেছেন, এ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর সম্পদ ও অবকাঠামোতে আঘাত হানার সুযোগ দেবে। তবে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের আশায় আলোচনার পথও খোলা রেখেছেন বলে ইঙ্গিত দেন। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা দুই কর্মকর্তা অবশ্য স্বীকার করেছেন, কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কিছু বিষয়ে যোগাযোগ চলমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত