বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত তাপকে বিশেষ ব্যবস্থায় স্টিম বা বাষ্পে রূপান্তর করে তা পোশাক কারখানায় সরবরাহ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। এই স্টিম ব্যবহার হচ্ছে কাপড়ের রঙ, ইস্ত্রি, ফিনিশিং এবং জীবাণু হ্রাসসহ পোশাক তৈরির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে।
পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রামের ছয়টি পোশাক কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত স্টিম সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমছে, অন্যদিকে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের কারণে এসব কারখানার পোশাকের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে বিদেশি ক্রেতাদের।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম ইপিজেডে ইউনাইটেড পাওয়ারের ৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কেজি স্টিম সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে প্রতি ঘণ্টায় টনপ্রতি ১৬০ কেজি ক্ষতিকর কার্বন-ডাইঅক্সাইড নির্গমন রোধ হচ্ছে কেন্দ্রটি থেকে।
এ উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে ইউনাইটেড পাওয়ার আন্তর্জাতিক পরিম-লেও প্রশংসাসূচক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে জমা হয়েছে এসডিজি ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড-২০২৫ এবং এশিয়ান ইনোভেশন এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৫ নামে দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
ইউনাইটেড গ্রুপের হেড অব ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড জেনারেল ম্যানেজার (পাওয়ার ডিভিশন) রাহাত বিন কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্জ্য তাপ থেকে অত্যাধুনিক কোরিয়ান প্রযুক্তিতে কোনো জ্বালানি ছাড়াই তৈরি এই গ্রিন স্টিম কারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে স্বল্পমূল্যে। পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কারখানার উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হচ্ছে।’
যেভাবে তৈরি হচ্ছে স্টিম : গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় ৪০০ থেকে ৫০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উচ্চ তাপমাত্রার এগজস্ট গ্যাস বা গরম বায়ু নির্গত হয়, যা সাধারণত বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই তাপ ও কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। পরিবেশের কথা বিবেচনা এবং উৎপাদনমুখী কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে এই তাপকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যেই ইউনাইটেড পাওয়ার এমন উদ্যোগ বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায় সেখান থেকে উৎপাদিত গরম বাতাস বাইরে বের হতে না দিয়ে তা পাঠনো হচ্ছে ‘এগজস্ট রিকভারি গ্যাস বয়লারে’। সেখানে এই তাপ ব্যবহার করে পানিকে গরম করে স্টিমে রূপান্তর করা হয়। উৎপাদিত স্টিম বিশেষ ইনসুলেটেড পাইপলাইনের মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ক্লোজড-লুপ ওয়েস্ট হিট রিকভারি নেটওয়ার্ক, যেখানে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বয়লার, স্বয়ংক্রিয় পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, উন্নত পাইপলাইন এবং ডিজিটাল মনিটরিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ স্টিম সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে ডিজেল, এলপিজি বা প্রচলিত গ্যাসভিত্তিক বয়লারের তুলনায় স্টিম উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইউনাইটেড পাওয়ারের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু নাসের দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে আটটি জেনারেটর রয়েছে। যার মধ্যে সাতটি থেকে স্টিম তৈরি করে কারখানাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। শিগগির আরেকটি জেনারেটর থেকেও সরবরাহ করা হবে এই স্টিম।
তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন স্টিম সরবরাহ নিশ্চিত করতে সবসময় একটি জেনারেটরের স্টিম ‘রিজার্ভ’ রাখা হয়। ফলে কারখানার উৎপাদন কাজে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না।
পোশাক শিল্পে স্টিমের ব্যবহার : পোশাক তৈরি ও ফিনিশিংয়ের বিভিন্ন ধাপে স্টিম (গরম বাষ্প) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি কাপড়কে সুন্দর, মসৃণ ও মানসম্মত করে। এটি মূলত ব্যবহৃত হয় কাপড়ের ভাঁজ দূর করে মসৃণ করতে ইস্ত্রি করার কাজে, কাপড়ে রঙ স্থায়ীভাবে বসাতে, কাপড় নরম রাখতে এবং পোশাকের কাক্সিক্ষত আকার নিশ্চিত করতে। এ ছাড়া তৈরি পোশাকে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতেও ব্যবহার হয় এই স্টিম।
স্টিম ছাড়া বড় আকারে দ্রুত ও মানসম্মত উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে রঙ ভালোভাবে বসে না, কাপড় শক্ত হয়ে যায় এবং পণ্যের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে সুফল : সাধারণভাবে কারখানাগুলোতে আলাদা বয়লার স্থাপন করে গ্যাস, ডিজেল বা কয়লা পুড়িয়ে স্টিম তৈরি করা হয়, যা ব্যয়বহুল এবং পরিবেশ দূষণকারী। কিন্তু এ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপচয় তাপ ব্যবহার করায় অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। এতে শক্তির অপচয় কমে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পায় এবং কারখানাগুলোর অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজনও পড়ে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমে গিয়ে ডাইং ও ফিনিশিং প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়ছে।
বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব বাড়ায় কম কার্বন নিঃসরণকারী কারখানা থেকে পোশাক কিনতে আগ্রহী হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো। এর ফলে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কারখানাগুলোর পোশাকের কদর বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
১৯৯৭ সালে ‘খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড’ নামে দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে ইউনাইটেড গ্রুপ। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১১৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে ইউনাইটেড পাওয়ার। এ ছাড়া ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে।
চট্টগ্রামে ৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ৫০ মেগাওয়াট চট্টগ্রাম ইপিজেডে এবং ২০ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হচ্ছে কর্ণফুলী ইপিজেডে। তবে রাতে বা ছুটির সময় যখন সেখানকার কারখানাগুলোর চাহিদা কমে যায় তখন এ অব্যবহৃত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় জাতীয় গ্রিডে।
একই প্রক্রিয়ার ৮২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ঢাকা ইপিজেডে। সেখানেও স্টিম তৈরি করে সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন কারখানায়। কর্মকর্তারা জানান, পোশাক কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের পাশাপাশি কম দামে মানসম্মত স্টিম খুবই দরকার। বিশেষ করে ইপিজেডগুলোতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। আর সেই কাজটি করছে ইউনাইটেড গ্রুপ।
