১৫ বছর ধরে মানবেতর জীবন সোহেলের

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:০২ এএম

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিয়া ইউনিয়নের টাঙ্গাইল্যা চালা গ্রামের সোহেল (৩৭) গত ১৫ বছর ধরে ঘরবন্দি। ২২ বছর বয়সে বিদ্যুৎ লাইনের কাজ করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মেরুদ- ভেঙে যায় তার। সেই থেকেই পায়ে আর শক্তি নেই। এখন শুধু শুয়ে বা হুইলচেয়ারে বসেই কেটে যাচ্ছে তার দিন।

ঘরের ভেতরেই খাওয়া, থাকা, এমনকি প্রসাব-পায়খানাও সারতে হয় তাকে। একসময় ছিলেন পরিশ্রমী বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি। বিয়ের পর সংসারের স্বপ্ন গুছিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন মাত্র। কিন্তু এক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। সোহেলের বাবা আব্দুল আজিজ মারা গেছেন ছয় বছর আগে। বৃদ্ধ মা রোবিয়া বেগমের দুটি কিডনিই এখন বিকল। ২১ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় বড় বোন রাবিয়াও ফিরে এসেছেন বাবার বাড়িতে। উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় পরিবারটি এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে।

দুর্ঘটনার পর যতটা সম্ভব চিকিৎসা করানো হয়েছিল, কিন্তু টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এখন কোমর থেকে নিচের অংশ সম্পূর্ণ অবশ আর শুয়ে থাকতে থাকতে শরীরে ঘা হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার ছয় মাস পরই স্ত্রী ইসমত আরা চলে যান। তারপর থেকে বৃদ্ধ মা ও বড় বোনই সোহেলের সেবা করছেন। দুই ভাই, তিন বোনের মধ্যে সোহেল সবার ছোট। বড় ভাই প্রবাসে থাকলেও তার অবস্থাও ভালো নয়। ঘর ঝড়ঝাপটায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ায় এখন মায়ের সঙ্গে বোন রাবিয়ার দুইচালা ঘরেই থাকতে হয় তাকে। প্রতি মাসে চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ জোগানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

রাবিয়া বেগম বলেন, ‘২১ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় বাবার বাড়িতে ফিরেছি। ভাই অসুস্থ হওয়ার পর মা-ই সব করতেন। এখন মায়ের কিডনির সমস্যাও বেড়েছে। কেউ একটু সাহায্য করলে হয়তো কোনোভাবে টিকে থাকতে পারব।’

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সোহেল বলেন, ‘দুর্ঘটনার পরই স্ত্রী চলে যায়। এখন মা ছাড়া আর কেউ নেই। মা অসুস্থ, টাকার অভাবে চিকিৎসাও হয় না। ঘর ভেঙে গেছে, একসঙ্গে থাকতে হয়। সুস্থ থাকলে স্ত্রীও যেত না, ঘরেও অভাব হতো না। তিনি দেশ-বিদেশে মানবিক মানুষদের সহযোগিতা চান।’

সোহেলের মা রোবিয়া বেগম বলেন, ‘মানুষ দিলে খেতে পারি, না দিলে না খেয়েই থাকি। ওষুধ কেনারও টাকা নেই। ছেলেটা যদি সুস্থ থাকত, তাহলে কারও কাছে চাইতে হতো না।’

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনসুর আহমেদ বলেন, ‘সোহেল সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন এবং তার মা বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। তার যেহেতু বাবা নেই এবং পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই, তাই তিনি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার অনুরোধও করতে পারেন। পাশাপাশি সরকারি সহযোগিতাও অব্যাহত থাকবে।’

চলতে না পারলেও মানুষের মতো বাঁচতে চান সোহেল। তিনবেলা খাবার জোটানোই যেখানে কঠিন, সেখানে চিকিৎসার খরচ বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব। স্থানীয়দের দাবি, সরকার কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে হয়তো একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারবে এই পরিবারটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত