বামপন্থিদের নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২২ এএম

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে গণতন্ত্র কায়েমের, ভোটাধিকার নিশ্চিতের ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর ঘোষণা দিয়েছে দেশের বামপন্থি দলগুলো। গতকাল শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় কনভেনশন থেকে এ নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

দিনব্যাপী কনভেনশন থেকে এ জোটে বাম-প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক দল ও সংগঠনগুলোকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। কনভেনশনে ঘোষণাপত্র পাঠের পাশাপাশি সাত দফা রাজনৈতিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবকে ভিত্তি করে আন্দোলন এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান আয়োজকরা।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও এর আকাক্সক্ষার পূরণ হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের ১৫ মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে, এবারের বিজয়ও হাতছাড়া হতে চলেছে। দেশ এখনো গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকট, নৈরাজ্য, দুর্নীতি, লুণ্ঠন এবং অবক্ষয়ের মধ্যে রয়েছে। সর্বগ্রাসী সংকট থেকে জনগণের মুক্তির জন্য বাম প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে ‘রেইনবো কোয়ালিশন’ গড়ে তুলতে হবে।”

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘যুক্তফ্রন্ট গঠন আজ খুবই জরুরি। তবে এ ফ্রন্ট শুধু নির্বাচনের জন্য নয়, সমাজকে পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জাতীয়তাবাদীরা ৫৪ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে, কিন্তু তারা জনআকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। তাই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে বাম-প্রগতিশীলদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বারবার মানুষ জীবন দেয়, নির্যাতন ভোগ করে, কিন্তু ক্ষমতায় যায় বুর্জোয়ারা। ফলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হবে।’ তিনি বিপ্লবের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন দুর্ভাবনার হোক বা দুর্ঘটনার যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট প্রস্তুত থাকতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘এই নতুন জোট গঠনের সূচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু; ৫৪ বছরের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির বিপরীতে একটি ভিন্ন ও নতুন ধারার সূচনা। এ ধারাকে দেশের ৬৪ জেলা, ৪৯৫ উপজেলা, ৪৫৭২ ইউনিয়ন এবং ৮৬ হাজার গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে।’

অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু বামপন্থি শক্তির ঐক্য নয়; প্রয়োজন বিস্তৃত জনগণের ঐক্য। এই ঐক্যই পারে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম করতে, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, ‘দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা ছিল বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের, যা প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে দেশকে নতুন দিশা দেখাতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের সামনে নতুন এক সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে। এ আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে পরিবর্তন সম্ভব।’

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে কনভেনশনে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। কনভেনশনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক সোহরাব হোসেন, প্রকৌশলী মনির উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ, ইউপিডিএফ নেতা অংকন চাকমা, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি এস এ সবুর, বাসদের (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ ভূঁইয়া, স্কপ নেতা আব্দুল কাদের হাওলাদার, জাতীয় গণফ্রন্ট নেতা আমিরুল নুজহাত মনীষা, কৃষক নেতা আব্দুস সাত্তার প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত