চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) ও চট্টগ্রাম-১১ (পতেঙ্গা-বন্দর)। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রায় এক মাস আগে দেশের ২৩৬ আসনের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত মহানগরীর এ দুই আসনসহ চট্টগ্রামের ছয়টি আসনে কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। ফলে আসনগুলোতে দলের নেতাকর্মীরাও নিজেদের প্রার্থী সম্পর্কে রয়ে গেছে অন্ধকারে। অন্যদিকে অন্তত ১০ মাস আগে থেকে নির্বাচনী এলাকার মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা। প্রার্থী মনোনয়নে এ বিলম্ব আসনগুলোর ভোটের সমীকরণে বিএনপিকে নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, কৌশলগত নানা কারণে কিছু আসনে মনোনয়নপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেনি বিএনপি। প্রার্থী ঘোষণা না হলেও এসব আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নেতাকর্মীদের ধানের শীষের পক্ষে মাঠে প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলের হাইকমান্ড যথাসময়ে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে।
যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনটির দিকে বিশেষ দৃষ্টি থাকে সব রাজনৈতিক দলেরই। অতীতে অধিকাংশ সময় দেখা গেছে, আসনটিতে যে দলের প্রার্থী জয়ী হন; সেই দলই সরকার গঠন করে। আবার যে প্রার্থী ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তার স্থান হয় সরকারের মন্ত্রিপরিষদে।
১০ মাস আগে চট্টগ্রামের সব আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। চট্টগ্রাম-৯ আসনে তারা প্রার্থী দিয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক এ কে এম ফজলুল হককে। তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত গণসংযোগ, উঠোন বৈঠক, চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটের মাঠ গোছানোর কাজ করে আসছেন। পাশাপাশি সাংগঠনিক টিমও পুরোদমে মাঠে রয়েছে নিজেদের প্রার্থীর জন্য।
এদিকে আসনটিতে (চট্টগ্রাম-৯) বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত হিসেবে দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের নাম ঘোষণা করলেও পরক্ষণে তা স্থগিত করা হয়। যে কারণে ওই আসনে ধানের শীষের কান্ডারি কে হচ্ছেন, তা অনিশ্চয়তার দোলাচলে রয়ে গেছে। মনোনয়ন স্থগিত হয়ে গেলেও পুরোদমে মাঠে রয়েছেন আবু সুফিয়ান। নিজেকে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় না দিলেও আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে নিয়মিত গণসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে, একই আসন থেকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে সরব কার্যক্রম চালাচ্ছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন তিনি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করও ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে প্রায় প্রতিদিনই এ আসনের বিভিন্ন এলাকায় নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে আসনটিতে আগামী নির্বাচনে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় কার নাম স্থান পাচ্ছে এখনো তা রয়ে গেছে সংশয়ের মধ্যে। যে কারণে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দলীয় প্রার্থীর মাঠ গোছানো অনেকটা কঠিন হতে পারে।
নগরীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আসন চট্টগ্রাম-১১ (পতেঙ্গা-বন্দর) আসনের প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কাস্টম হাউজ, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে এ আসনে। আসনটিতে এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি দলের পক্ষ থেকে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগে একাধিকবার ওই আসন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। আসনটি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিপরিষদেও জায়গা করে নেন তিনি। কিন্তু এবার পুরনো আসন বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয় তাকে। এ অবস্থায় শূন্য পড়ে থাকা চট্টগ্রাম-১১ আসনে কাকে প্রার্থী করছে বিএনপি, তা নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু চৌধুরী ওই আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন এমন কথা চাউর রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু একই পরিবার থেকে দুজনকে দল মনোনয়ন দেবে কি না, এটা নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা সংশয় কাজ করছে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানও আসনটি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে সাংগঠনিক কর্মসূচির বাইরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সেখানে কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান নেই।
আসনটিতে পুরোদমে মাঠে রয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শফিউল আলম। এ আসনের অন্তর্ভুক্ত সবকটি ওয়ার্ডেই ইতিমধ্যে উঠোন বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজের ভোটের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন চসিকের সাবেক এ ওয়ার্ড কাউন্সিলর। বিপরীত মেরুর একাধিক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে পুরনো ঘনিষ্ঠতার কারণে ভোটের মাঠে তিনি বাড়তি সুবিধা পাবেন বলেও মনে করছেন তার কর্মী-সমর্থকরা।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশে ৬৪টি আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচনে জোটভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতাসহ সাংগঠনিক কৌশলগত নানা কারণে এসব আসনের মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে। দলীয় হাইকমান্ড যথাসময়ে এসব আসনের প্রার্থী ঘোষণা করবে। তিনি বলেন, প্রার্থী ঘোষণা না হলেও সেসব আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ধানের শীষের পক্ষে নিয়মিত গণসংযোগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
