হৃদয় সুস্থ রাখার তাগিদ

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:২৪ এএম

মানুষের জীবনযাত্রা যত জটিল হয়, হৃদয়ের জগৎ তত ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। চারদিকে সম্পর্কের টানাপড়েন, দুনিয়ার আকর্ষণ, সব মিলিয়ে হৃদয় এক অদৃশ্য চাপের মুখে পড়ে থাকে। অথচ এই হৃদয়ই মানুষের সত্য উপলব্ধির কেন্দ্র, ইমানের আলো ধারণের স্থান। হৃদয়ের স্বচ্ছতা নষ্ট হলে মানুষ বাহ্যিকভাবে যতই সফল হোক, ভেতরে অশান্তি জমতে থাকে। কোরআন ও সুন্নাহ হৃদয়ের এই সূক্ষ্ম জগৎকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। হৃদয় সুস্থ থাকলে মানুষও সুস্থ পথে চলে আর হৃদয় অসুস্থ থাকলে নষ্ট হতে থাকে তার চিন্তা, আচরণ ও চরিত্র। তাই মুমিনের বড় দায়িত্ব হলো নিজের হৃদয়কে সুস্থ রাখা, সেই রোগগুলোকে চিহ্নিত করা, যা ধীরে ধীরে তাকে দুর্বল করে দেয়। আধ্যাত্মিক এই অবক্ষয় কখনো আচরণের মাধ্যমে, কখনো অভ্যাসের মাধ্যমে, আবার কখনো দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। মুমিনের হৃদয় হলো আল্লাহর মারেফাত ও ভালোবাসার আধার। কিন্তু দুনিয়াবি কিছু বদভ্যাস ও পাপাচারের কারণে এই আয়নার মতো স্বচ্ছ হৃদয়ে মরিচা ধরে, কালো দাগ পড়ে এবং ধীরে ধীরে তা আধ্যাত্মিকভাবে মৃত হয়ে যায়। হৃদয় নষ্ট হয়ে গেলে মানুষের ভেতর থেকে আল্লাহর ভয়, ইবাদতের স্বাদ এবং সত্য গ্রহণের যোগ্যতা হারিয়ে যায়। হৃদয়কে ধ্বংসকারী এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে অন্তরের বিষ বলা হয়।

মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা এবং একে অপরের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলামও বৈরাগ্যবাদ বা সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে বনে-জঙ্গলে বসবাস করাকে সমর্থন করে না। কিন্তু প্রতিটি বিষয়েরই একটি সীমারেখা রয়েছে। যখনই মেলামেশা প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে নিছক আড্ডা, সময়ক্ষেপণ বা বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তখনই তা মুমিনের অন্তরের জন্য বিষাক্ত হয়ে ওঠে। আর এই অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা আমাদের অন্তরকে অসুস্থ করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর জিকির ছাড়া বেশি কথা বলবে না। কেননা আল্লাহর জিকির ছাড়া কথা বেশি বললে মন কঠোর হয়ে যায়। আর মানুষের মধ্যে কঠোর হৃদয়ের ব্যক্তিই আল্লাহর (রহমত) থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে। (জামে তিরমিজি) তাহলে কি আমরা মানুষের সঙ্গে মিশব না? অবশ্যই মিশব। তবে তার একটি মাপকাঠি থাকতে হবে। ওলামায়ে কেরাম বলেন, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা হওয়া উচিত খাবারে লবণের মতো। তরকারিতে লবণের পরিমাণ যেমন ঠিকঠাক হলে স্বাদ বাড়ে, কিন্তু বেশি হলে তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়, তেমনি মেলামেশাও পরিমিত হতে হবে। মানুষের মন এক বিচিত্র জগৎ। এখানে যেমন ইমান ও তাকওয়ার বীজ রোপিত হয়, তেমনি উদাসীনতা ও দুনিয়াবি মোহের আগাছাও জন্ম নেয়। আশা-অকাক্সক্ষা এমন এক সমুদ্র, যার কোনো কূলকিনার নেই। আর হদয়ের সুস্থতার অন্তরায় হলো হলো দীর্ঘ আশা। দীর্ঘ আশা বলতে আল্লাহর রহমতের আশা বোঝায় না, বরং এর অর্থ হলো, দুনিয়ায় বহুদিন বেঁচে থাকার মিথ্যা স্বপ্ন দেখা এবং দুনিয়া অর্জনের জন্য নানা পরিকল্পনা সাজানো। মৃত্যু ও আখেরাতকে ভুলে গিয়ে দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছনে এই অবিরাম ছোটাই মানুষের অন্তরকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়।

ইসলামি পরিভাষায় দীর্ঘ আশা হলো, এই বিশ্বাস লালন করা যে, আমার মৃত্যু এখনই হচ্ছে না, হাতে অনেক সময় আছে, বার্ধক্যে ইবাদত করব, আগে দুনিয়াটা গুছিয়ে নিই। এটি এমন এক মরীচিকা, যা মানুষকে মুসাফিরের পরিবর্তে দুনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে ভাবতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার সাহাবিদের সামনে মাটিতে একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন, তার মাঝখান থেকে একটি রেখা বাইরে বের করে দিলেন। তিনি বললেন, বাইরে বেরিয়ে যাওয়া রেখাটি হলো মানুষের আশা, যা তার হায়াত বা আয়ুর চেয়েও দীর্ঘ। (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ মানুষ এমন সব পরিকল্পনা করে, যা বাস্তবায়ন করার মতো আয়ু তার নেই। আলী (রা.) বলেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি ভয় করি। এক. কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ, যা সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। দুই. দীর্ঘ আশা, যা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা) আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখার প্রভাব হৃদয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এর চেয়ে অনিষ্টকর আর কিছু নেই। বান্দাকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে এটি মূল ভূমিকা পালন করে। এটি কল্যাণ ও গৌভাগ্য থেকেও ব্যক্তিকে বঞ্চিত রাখে। কারণ কেউ যখন আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়, তখন আল্লাহ তাকে সেই ব্যক্তির ওপরই ন্যস্ত করে দেন এবং তার মাধ্যমেই তাকে অপমানিত ও অপদস্থ করেন। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে সম্পর্ক রাখে, তাও সফল হয় না। সব আশা-উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে এই আশায় যে, তাদের সাহায্য করা হবে। অথচ এসব উপাস্য তাদের সাহায্য করার সক্ষমতা রাখে না।’ (সুরা ইয়াসিন ৭৪-৭৫)

খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। সুস্থ শরীর ও সবল মন নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য পরিমিত আহার গ্রহণ করা অপরিহার্য। কিন্তু যখনই এই আহার প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা আর শক্তির উৎস থাকে না, বরং তা শরীর ও আত্মার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। একে অতিভোজন বলা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোজন মানুষের হৃদয়কে নষ্ট করে দেয়। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, পেট হলো সব প্রবৃত্তি ও আবেগের উৎস। একে নিয়ন্ত্রণে না আনলে আত্মশুদ্ধি সম্ভব নয়। মিকদাম ইবনে মাদিকারিব (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র মানুষ ভরাট করে না। পিঠের দাঁড়া সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমা খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আর বেশি ছাড়া যদি তা সম্ভব না হয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবাবের জন্য, এক- তৃতীয়াংশ পানির জন্য, আরেক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখবে। (জামে তিরমিজি)

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত