শীতের সকাল। শহরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সপ্তর্ষী অপেক্ষা করছিল। আজ তার ইংরেজি পরীক্ষা। হাতে ছোট্ট একটা পেন্সিল বক্স আর স্কেল। কিন্তু চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা আর মনে একটাই প্রশ্ন ‘আজ পরীক্ষা হবে তো?’ সপ্তর্ষী জানে, তার শিক্ষকরা আন্দোলনে আছেন। বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি তাদের বহু দিনের। সেই দাবিতে রাস্তায় দাঁড়ানোও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ছোট সপ্তর্ষীর ছোট মনের জগতে একটা ধারণা বদ্ধপরিকর হয়ে আছে। বছরের শেষে বার্ষিক পরীক্ষা হয়। এই স্বপ্ন নিয়েই সে পুরো বছর বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেছে। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষী বলল, ‘মা, আজ স্যাররা আসবেন না। আন্দোলন এখনো চলছে।’ সপ্তর্ষীর চোখে পানি এসে গেল। এটি শুধু একজন সপ্তর্ষীর গল্প নয়। বাংলাদেশে হাজার হাজার সপ্তর্ষীর গল্প এখন এক রকম। বিশ্বের শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে শিক্ষকরা ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমেছেন বহুবার। এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু শিক্ষার্থীর স্বার্থকে কেন্দ্র করেই আন্দোলনের সময় ও ধরন নির্ধারণ করা, শিক্ষকতার নৈতিক ভিত্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অতীতে আমাদের দেশেও শিক্ষক নেতারা এই নৈতিকতার উদাহরণ রেখেছেন। যে কারণে সমাজে ‘শিক্ষক’ শব্দটির প্রতি শ্রদ্ধা এখনো অটুট।
জাপানসহ উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকরা আন্দোলন করলে, সাধারণত শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরির প্রভাব কমানোর জন্য পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে জাপানের একটি শিক্ষক ইউনিয়ন নীতি ও বেতন সম্পর্কিত দাবিতে আন্দোলন করেছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষা বা ক্লাসের সময়ে শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত করেনি। বরং সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসে। ফিনল্যান্ডে ২০১৯ সালে হেলসিঙ্কির শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করলেও, পরীক্ষা চলাকালীন কর্মবিরতি স্থগিত রাখেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতেও শিক্ষকরা কর্মপরিবেশ ও বেতনের দাবিতে আন্দোলন করলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার সময় কার্যক্রম বন্ধ করেননি। এমনকি ভারতের কেরালার শিক্ষক রাজেশ রাজ্যব্যাপী ধর্মঘটের সময় বাড়িতে বসে ছাত্রদের অনলাইনে পড়িয়েছিলেন। তার একটাই যুক্তি, ‘শিক্ষার্থীর ক্ষতি আমি হতে দিতে পারি না; পেশার প্রথম নৈতিকতা দায়িত্ব।’ এসব উদাহরণ স্পষ্ট করে যে, শিক্ষক আন্দোলন হতে পারে, কিন্তু সেটি শিক্ষার্থীর স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে। যখন শিক্ষকরা বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, পরীক্ষার মৌসুমে কর্মবিরতি করেন, যখন তারা ঘোষণা দেন যে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস হবে না, তখন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড় করানো হয় এক জটিল দ্বন্দ্ব : ‘স্বার্থ আগে নাকি দায়িত্ব?’ ছোট মস্তিষ্কের শিশুরা এমন বার্তা পেলে, সমাজের ভবিষ্যৎ মানসিক গঠন কি প্রভাবিত হবে না? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বারবার শিক্ষকদের আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরীক্ষা শেষে, নির্ধারিত সময়ে, আলোচনার টেবিলে সব দাবি বিবেচনা করা হবে। কিন্তু শিক্ষক সংগঠনগুলো ‘এখনই চাই, এই মুহূর্তে চাই’ এই অবস্থানে অনড়। এই তাড়াহুড়োই প্রশ্ন জাগায় শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের ধৈর্য, সময়জ্ঞান ও বিবেচনার পাঠ দেন, তিনি নিজে কেন সেই একই মূল্যবোধ অনুসরণ করতে চান না?
বাংলাদেশের প্রত্যেক শিক্ষকই ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বপরায়ণ, সৎ, এবং নিঃস্বার্থ মনোভাব নিয়ে পেশায় আসেন, এটা সত্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা হাজারো শিক্ষক যেসব ত্যাগ করে শিক্ষা প্রদান প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটিই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে। শিক্ষকদের এমন ত্যাগ, বাংলাদেশের শিক্ষা-বাস্তবতায় একটি কঠিন সত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে। এ দেশে শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি একটি নীরব ত্যাগের ক্ষেত্র। পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম পথ পেরিয়ে তারা প্রতিদিন শিশুদের কাছে পৌঁছান, বর্ষাকালে কোমর সমান পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে যারা স্কুলে আসেন, কিংবা বিদ্যালয়ের ছাদে পানি চুঁয়ে পড়লেও তারা হাল ছাড়েন না। এমনকি অনেক অনুদানহীন বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিজের অর্থ দিয়ে শিক্ষাসামগ্রী কেনেন। দুর্যোগে আক্রান্ত অঞ্চলে বহু শিক্ষক আশ্রয়কেন্দ্রে এসে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে স্থানান্তর করেন। এ দেশের অসংখ্য শিক্ষক মাসের পর মাস বেতন না পেয়েও, ক্লাস চালিয়ে গেছেন। শুধু এই বিশ্বাসে যে, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন থেমে না যায়। ফলে শিক্ষকদের নৈতিক দায়বদ্ধতার ইতিহাস বিস্তৃত ও গৌরবময়। বর্তমান আন্দোলনের কঠোরতা যখন শিক্ষার্থীর ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি করে, তখন দেশবাসীর মনের ভেতরে দ্বিধা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। জাতীয় পর্যায়ে এমন আন্দোলনের ধরন যখন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তখন বলা জরুরি যে, শিক্ষা দর্শনের প্রথম লাইনই বলে ‘শিক্ষা হলো মানবিক চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া।’ চরিত্র নির্মাণের কারিগররাই যদি দ্বিধাগ্রস্ত হন বা শিক্ষার্থীর ওপর দায়িত্ব ফেলে রাখেন, তবে ভবিষ্যতের ফল কতটা সুমিষ্ট হবে? সপ্তর্ষীরা আগামী বাংলাদেশের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা। তারা আজ যদি দেখে, নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য দায়িত্ব ফেলে রাখা যায়, শিক্ষার্থীর স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত দাবি বড়, কিংবা আলোচনা ও সমঝোতার পথ অপেক্ষা কঠোরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাহলে তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কি শেখাবে? তারা যদি শেখে যে চাপ দিলে বা সবকিছু থামিয়ে দিলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নাগরিকরা কি দায়িত্বশীল, বিবেচনাপূর্ণ ও নৈতিক হবে? এটাও সত্য, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অসাম্য, প্রশাসনিক জটিলতা, পদোন্নতির অনিশ্চয়তা ও কাজের চাপ তাদের ক্লান্ত করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার এই কর্মশালাটি টেকসই করতে হলে রাষ্ট্রকে শিক্ষকদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নানা দেশে দেখা গেছে, যখন শিক্ষক সন্তুষ্ট, তখন শিক্ষার্থীর শেখার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ফলস্বরূপ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকরা দাবি তুলছেন বেতন-ভাতা পর্যাপ্ত নয়, তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই দাবি অবহেলা করা যায় না।
অন্যদিকে রাষ্ট্র বলছে একটি সুষম প্রক্রিয়া আছে, আলোচনা আছে, বাজেট আছে, এসবের মধ্য দিয়েই সমাধান আসবে। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার শিশু, যারা বুঝতেই পারে না আন্দোলন কী, আলোচনার প্রক্রিয়া কী বা রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা কী? তারা আজ অনিশ্চয়তায় ডুবে আছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার নয়, এটি বিশ্বাসের সংকট। ছাত্রছাত্রীরা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও রাষ্ট্র এই তিনটির ওপর ভরসা করেই দায়বোধ শেখে। এই তিনটির কোনো একটির ওপরে সন্দেহ তৈরি হলে শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। শিক্ষকরা অবশ্যই তাদের ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলন করতে পারেন। এটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু আন্দোলন যদি এমন সময়ে হয়, যখন শিশুরা বছরের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে যাচ্ছে, তখন সেখানে এক ধরনের নৈতিক প্রশ্ন থেকেই যায়। ছাত্রদের পরীক্ষা ব্যাহত হলে ক্ষতির পরিমাণ শুধু একটি বছরের রিপোর্ট কার্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের আত্মবিশ্বাস নড়ে যায়, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ কমে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। সপ্তর্ষী সেদিন বাড়ি ফিরে কান্না করেছিল। তার মা তাকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, ‘মা, তোমাদের স্যাররা তো সারা জীবনই তোমাদেরই মঙ্গল চেয়েছেন।’ তিনি উদাহরণ দিলেন, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিকাণ্ডের সময় শিক্ষক মাহেরিন সুলতানা নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের জীবন হারান। তিনি বললেন, রানা প্লাজা ধসের পর নিকটবর্তী স্কুলগুলোর শিক্ষকরা আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেরাই আহত হয়েছিলেন। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গেছেন; পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের সময় শিক্ষকরা বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র বানিয়ে রেখেছেন; চরাঞ্চলের শিক্ষকরা নৌকা ভাড়া করে ছাত্রদের খুঁজে খুঁজে স্কুলে এনেছেন। বাংলাদেশের হাজারো শিক্ষক অনুদানহীন বিদ্যালয়ে, দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চলে, প্রায় বিনা উপকরণে বছরের পর বছর কাজ করেছেন। সপ্তর্ষীর মা বললেন, ‘মা, যে দেশ এত শিক্ষককে এত শিশুদের জন্য জীবন দিতে দেখেছে, সেই দেশের শিক্ষকরা নিশ্চয়ই তোমাদের ক্ষতি হতে দেবেন না।’ এই কথার মধ্যেই ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি অভিভাবকের গভীর বিশ্বাস। শিক্ষকরা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।’
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, আজকের এই আন্দোলনের পথ শিক্ষার্থীর জন্য মঙ্গল পথেই এগোচ্ছে? যদি শিক্ষকরা পথ হারান, তাহলে সপ্তর্ষীদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে? শিক্ষাব্যবস্থার সংকট সমাধানের পথ আছে। আলোচনাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান হাতিয়ার। সময়ের চাকা থেমে থাকে না। সপ্তর্ষীদের বড় হওয়ার সময়ও থেমে থাকবে না। আজকের ভুল সিদ্ধান্ত, আগামীর সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য, প্রয়োজন সহনশীল আলোচনা, প্রয়োজন সমঝোতার। নীতিনির্ধারকদেরও বুঝতে হবে, শিক্ষক সমাজের শক্তির কথা। শিক্ষকদের সম্মান ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে, কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই টেকসই হয় না। কারণ দিন শেষে শিক্ষা শুধু জ্ঞান নয় এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা। আর সেই কর্মশালার প্রথম স্থপতিই শিক্ষক।
লেখক: আইন-পরামর্শক ও চেয়ারম্যান ইক্ষাণ ল অ্যাসোসিয়েটস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ফার্ম
