এক এয়ারলাইন্সের ভুলে ভারতে বিমান–নেটওয়ার্ক অচল, ইন্ডিগো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:০৪ পিএম

ভারতে গত সপ্তাহে টানা দুই হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিলের পর দেশটির শীর্ষ এয়ারলাইন্স ইন্ডিগোকে নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। নতুন উড্ডয়ন–সংক্রান্ত বিধিনিয়ম মানতে না পারা এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে সৃষ্ট এই বিপর্যয়ে বিপাকে পড়েছেন লাখো যাত্রী।

কংগ্রেসের এমপি রাহুল গান্ধী এ ঘটনাকে ‘মনোপলির মতো একচেটিয়া বিমানব্যবস্থা’ বলে উল্লেখ করেছেন। এক্স–এ প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি মনোপলি ও অলিগোপলি তৈরি হওয়ার বিরোধী। অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।’

সংকটের মূল কারণ ছিল পাইলটের ঘাটতি। নতুন ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণবিধি—‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশনস (এফডিটিএল)’—পাইলটদের কাজের সময় সীমিত করে দিয়েছে। এ বিধিনিয়ম অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইন্ডিগোর বেশিরভাগ সিডিউল ভেঙে পড়ে।

বিশ্বের বড় বাজারগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে ভারত টুডে জানিয়েছে, নিজ দেশের আকাশে ইন্ডিগোর মতো এমন প্রভাবশালী অবস্থান কোনো বড় এয়ারলাইন্সের নেই। এর ধাক্কা এখন পুরো ভারতীয় বিমান পরিবহন খাতে অনুভূত হচ্ছে।

কারণ শুধু একটি বিপর্যয়সপ্তাহ নয়—বরং বাজারে ইন্ডিগোর বিশাল দাপটই সমস্যার গভীরতা বোঝায়।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটে ইন্ডিগোর বাজার–দখল এখন ৬৪.২ শতাংশ। যা এয়ার ইন্ডিয়ার ২৭.৩ শতাংশের চাইতে দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে একটি কোম্পানির সমস্যা পুরো ব্যবস্থাকে টেনে নেয় বিপর্যয়ে। ইন্ডিগো যখন থমকে যায়, ভারতের বড় অংশের এভিয়েশন নেটওয়ার্কও তখন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

ইন্ডিগোর বহরে রয়েছে প্রায় ৪০০ বিমান, যেখানে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান সংখ্যা ১৯১। গত এক বছরে দেশজুড়ে ইন্ডিগোর ফ্লাইট পরিচালনার সংখ্যা ছিল ৬.৮ লাখেরও বেশি, আর এয়ার ইন্ডিয়ার কম ১.৫ লাখ। যাত্রী সংখ্যায়ও তাই ইন্ডিগো এগিয়ে—এয়ার ইন্ডিয়ার সামান্য বেশি ২ কোটি যাত্রীর বিপরীতে ইন্ডিগো বহন করেছে ১০ কোটিরও বেশি যাত্রী। একারণে ইন্ডিগোর যেকোনো বিলম্ব বা বাতিলে বড় পরিসরে যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওএজিএ অ্যাভিয়েশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের তথ্য ব্যবহার করে ভারত টুডের ওএসআইএনটি দল দেখিয়েছে—বিশ্বের বড় কোনো বিমানবাজারে একক কোনো এয়ারলাইন্স নিজের দেশে এমনভাবে আধিপত্য বিস্তার করেনি।

ভারতের বাজার কঠোর অর্থে ডুপলি না হলেও ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া (এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসসহ) মিলে প্রায় ৯২ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। কার্যত এটি দুই প্রতিষ্ঠানের দৌড়ে সীমিত হয়ে পড়েছে।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো কিছু দেশে ডুপলির উদাহরণ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে চারটি বড় এয়ারলাইন—আমেরিকান (২১%), সাউথওয়েস্ট (১৯%), ডেল্টা (১৮%) ও ইউনাইটেড (১৬%)—মিলে বাজার ভাগ করে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে ব্যবধান বিপজ্জনকভাবে অসম।

মধ্যপ্রাচ্যে এমিরেটস একাই প্রায় অর্ধেক বাজার ধরে রেখেছে, আর এথিহাদ রয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশে। অস্ট্রেলিয়ায় ক্যান্টাস (৩৭.৫%), ভার্জিন অস্ট্রেলিয়া (৩৪.৪%) এবং জেটস্টার (২৬.৪%) মিলে বাজারে অলিগোপলির মতো অবস্থা তৈরি করেছে।

এক সপ্তাহের বিশৃঙ্খলার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার ইন্ডিগো ১৩৮টির মধ্যে ১৩৭ গন্তব্যে ১ হাজার ৮০২টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে এবং আরও ৫০০ ফ্লাইট বাতিল করবে।

এ পর্যন্ত যাত্রীদের ফেলে যাওয়া ৪ হাজার ৫০০ ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি ৪ হাজার ৫০০ ব্যাগ আগামী ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে মালিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে এয়ারলাইন্সটি।

ভারতের আকাশে যে বাজার নিয়ন্ত্রণ, তা ইন্ডিগোর জন্য যেমন শক্তি, তেমনই পুরো বিমান শিল্পের জন্য ঝুঁকিও বটে—গত সপ্তাহের অচলাবস্থা সেই বাস্তবতাই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত