জাতীয় সংসদ নির্বাচনী পরিবেশ শুরু হলেই, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি প্রদানের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জনমুখী বিভিন্ন বক্তব্য, জোট গঠন এবং ভোটের রাজনীতি তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির আড়ালে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত লক্ষ্য জনসেবা, নাকি ক্ষমতা দখল এই প্রশ্নটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ। যখন নির্বাচন পদ্ধতি এবং ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার মতো কৌশলগত বিষয়গুলো দলগুলোর মূল এজেন্ডা হয়ে ওঠে, তখন জনস্বার্থ স্বাভাবিকভাবেই উপেক্ষিত হয়। এই মৌলিক দ্বন্দ্বের স্বরূপ বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ভবিষ্যৎ। ক্ষমতার রাজনীতির প্রাধান্য এবং জনকল্যাণের আদর্শের মধ্যে সংঘাতের কারণ, পরিণতি এবং এ সংকট থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য পথ কী হতে পারে? যেকোনো জাতির রাজনৈতিক সুস্থতা ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে, তার নেতাদের নির্ধারিত অগ্রাধিকারের ওপর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূল সংকটটি সৃষ্টি হয়েছে ঠিক এখানেই অগ্রাধিকার নির্ধারণের দ্বন্দ্বে। যখন জনকল্যাণের মতো মৌলিক লক্ষ্যকে ছাপিয়ে পদ্ধতিগত এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিতর্ক মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন শাসনব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি হয় এবং একটি গভীর সংকট জন্ম নেয়। অনেকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য এবং তাদের কর্মকাণ্ডের বৈপরীত্যই অচলাবস্থার মূল কারণ।
অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের কথার সঙ্গে কাজের বিস্তর ফারাক। তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে জনকল্যাণের কথা থাকলেও, সব মনোযোগ এবং শক্তি ব্যয় হয় নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল এবং ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে। এর অনিবার্য পরিণতি হলো জনস্বার্থের চরম উপেক্ষা। যখন নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য ‘ক্ষমতা’ হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি বা নাগরিক সুরক্ষার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পেছনের সারিতে চলে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এ অবহেলা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষয় করে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায় এবং প্রতিভাবানদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করে। অগ্রাধিকারের এই দ্বন্দ্বই রাজনীতিকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সংকীর্ণ বলয়ে আবদ্ধ করে ফেলে। এটিই পরবর্তীকালে এক বিধ্বংসী সংঘাতের রাজনীতিকে উসকে দেয়। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো, ‘রাজনীতিতে সমঝোতার পরিবর্তে বৈরিতা।’ এই বৈরিতা নিছক আদর্শিক মতপার্থক্য নয়, বরং এটি এক ধরনের শূন্য-অঙ্কের খেলা। যেখানে একপক্ষের বিজয় অন্যপক্ষের জন্য অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চরম বৈরী মানসিকতার কারণে আপস বা সমঝোতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়, যা একটি ‘সংকটজনক অবস্থা’ তৈরি করে এবং গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তখন গঠনমূলক আলোচনার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তারা একমত হতে পারে না, যা দেশকে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যায়। যখন রাজনৈতিক দলগুলো শুধু একে অপরকে প্রতিহত করার রাজনীতিতে মগ্ন থাকে, তখন জনস্বার্থ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি থেমে যায়। এই সংঘাতের রাজনীতি দেশকে এমন এক অন্ধকার পথে চালিত করছে, যা কোনো নাগরিকের কাম্য হতে পারে না। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি কার্যকর পথের সন্ধান করা অপরিহার্য।
চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং একটি কার্যকর এবং সর্বজনগ্রাহ্য সমাধানের রূপরেখা তৈরি করা অপরিহার্য। সংকটের মূল যেহেতু ক্ষমতার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, তাই এর সমাধানও নিহিত রয়েছে রাজনীতির মৌলিক উদ্দেশ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মধ্যে। আর সেই উদ্দেশ্যটি হলো জনকল্যাণ। প্রকৃতপক্ষে, ‘জনকল্যাণের রাজনীতিই সকলের প্রত্যাশা।’ এই আকাক্সক্ষাটিই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার মূল ভিত্তি। রাজনীতিকে যখন নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল এবং ক্ষমতার লড়াই থেকে সরিয়ে এনে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে তখন একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে। এজন্য প্রয়োজন দলগুলোর রাজনৈতিক মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন। ঐকমত্য হতে হবে জনকল্যাণকে রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করার বিষয়ে। তবে দলগুলোর মধ্যে বিদ্যমান গভীর সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ঐকমত্য অর্জনের পথকে অত্যন্ত বন্ধুর করে তুলেছে। তা সত্ত্বেও, এই কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, কারণ এটিই সংকটের বাস্তবসম্মত এবং টেকসই সমাধান। জনকল্যাণের প্রশ্নে এই ন্যূনতম ঐকমত্যই পারে বৈরিতার পরিবর্তে সমঝোতার আবহ তৈরি করতে এবং জাতিকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট মূলত ক্ষমতার রাজনীতি এবং জনকল্যাণের আদর্শের মধ্যে এক গভীর দ্বন্দ্বের ফল। নির্বাচন এলে জনমুখী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, দলগুলোর প্রকৃত অগ্রাধিকার থাকে ক্ষমতা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্কে ফলে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয়। এই পরিস্থিতি রাজনীতিতে এক চরম বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যা দেশকে একটি সংকটময় অবস্থায় উপনীত করেছে। প্রকারান্তরে জাতীয় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ হলো রাজনীতির মূল লক্ষ্যে ফিরে আসা, যা হচ্ছে জনকল্যাণ। এটি কোনো দলের একক প্রচেষ্টা দিয়ে সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। সব রাজনৈতিক দলের প্রতি চূড়ান্ত আহ্বান থাকবে, তারা যেন তাদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করে। জনকল্যাণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে একটি ন্যূনতম সমঝোতায় পৌঁছানো সময়ের দাবি নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ। এ মুহূর্তে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, তাদের শুভবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টির ওপর। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং একটি অন্তর্র্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছে। আশা করা যায়, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। এই সংস্কারের কেন্দ্রে রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, যার মূলে একটি বড় সংকট বিদ্যমান। এই অস্বচ্ছতা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং ভোটের অধিকারকে অর্থহীন করার নামান্তর। যখন নির্বাচনব্যবস্থা স্বচ্ছ হয়, তখন সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তাই, এই ব্যবস্থাকে সংস্কার করার জন্য কিছু মৌলিক ভিত্তি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্রের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো একটি গণতান্ত্রিক মানসিকতা, যার মূল ভিত্তি হলো ‘পরমতসহিষ্ণুতা’। এর সহজ অর্থ হলো, অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, এমনকি সেই মতামত নিজের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত হলেও।
ভিন্নমতকে সম্মান জানানো এবং শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার মানসিকতাই একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে। প্রখ্যাত দার্শনিক ভলতেয়ারের একটি বিখ্যাত উক্তি এই ধারণাটিকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে : ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবনও দিতে পারি।’ এই উক্তিটির তাৎপর্য বিশাল। এটি শেখায় যে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেকেরই নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। এই দর্শন যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন দমন-পীড়ন বা সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা ও সমঝোতার পথ খুলে যায়। এই নীতিটিই গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্র থেকে পৃথক করে, যেখানে ভিন্নমতকে সহ্য করা হয়। এই মানসিকতা ছাড়া কোনো আইন বা প্রতিষ্ঠানই গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে পারে না। পরমতসহিষ্ণুতার এই মানসিকতা একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেয়। কিন্তু এই সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ সালিশি ব্যবস্থা। এটিই আমাদের দ্বিতীয় ভিত্তি : একটি সত্যিকারের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনকে একটি খেলার রেফারির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। রেফারির কাজ হলো, নিরপেক্ষভাবে নিয়মকানুন প্রয়োগ করে খেলা পরিচালনা করা, যাতে কোনো দলই অন্যায় সুবিধা না পায়। নির্বাচন কমিশনের কাজও ঠিক তেমনই একটি নিরপেক্ষ ও ন্যায্য নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা।
‘প্রকৃত অর্থে স্বাধীন’ বলতে বোঝায়, নির্বাচন কমিশন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ থেকে সম্পূর্ণমুক্ত থেকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে। এর মানে হলো, সরকারের কোনো অংশ বা কোনো প্রভাবশালী মহল কমিশনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে না। কমিশন যদি স্বাধীন না হয়, তবে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়ে যায়। এতে নির্দিষ্ট কোনো দল বা প্রার্থী অন্যায় সুবিধা পেতে পারে, যা নির্বাচনের ফলাফলের ওপর জনগণের আস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। একটি স্বাধীন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করে। কিন্তু এই কাঠামোর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে নাগরিকদের অংশগ্রহণের ওপর। গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণ আর জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে ভোটের মাধ্যমে। তাই, ‘মানুষ যেন পছন্দের প্রার্থীকে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে’ তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর অর্থ হলো, প্রত্যেক ভোটারকে এমন একটি পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি কোনো প্রকার ভয়, হুমকি বা বাধার সম্মুখীন না হয়ে নিজের বিবেক অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে শুরু করে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে সুরক্ষিত। বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে পরমতসহিষ্ণুতা দেখাতে হবে। কেননা, পরমতসহিষ্ণুতা একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সেই পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করে। মনে রাখতে হবে, নিরাপদ ভোটদানই নিশ্চিত করে, নির্বাচনের ফল জনগণের প্রকৃত ইচ্ছাকেই প্রতিফলিত করেছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
[email protected]
