রঙিন ‘চোস্ত পায়জামা’র সরল পাঠ

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৪৯ এএম

পরিবেশের কুৎসিত বীভৎসতা ও ইতরতার মধ্যেও মানবিক হৃদয়ের সন্ধান করেন যে সংবেদনশীল চোখ লেখক সিরাজুল ইসলাম তেমন একজন। তার গল্পগুলো অতি সাধারণ জীবনের কথা বলে, বলে স্মৃতির কথা, বিভ্রমের কথা, রোগ-শোক অপ্রাপ্তির কথা। সম্প্রতি পাঠ করলাম সিরাজুল ইসলামের ‘চোস্ত পায়জামা’ নামক গল্পগ্রন্থটি। কলকবজার সঙ্গে পরিচয় যার তিনি আঁকছেন মানবজীবনের জটিলতা, প্রাত্যহিক সংকট এবং সম্পর্কের রহস্যময় দিক; এক প্রকার বিস্ময় নিয়েই পড়লাম। তার গল্পগুলোকে যদি জীবনবাদের দৃষ্টকোণে দেখি তাহলে দ্বিপক্ষীয় অভিযোগ, ভুল-বোঝাবুঝি এবং পারস্পরিক দূরত্বের বাস্তব আচরণ যেমন লক্ষ্যদৃষ্ট হয়, তেমনি যা আছে তা নিয়েও সন্তুষ্টি দেখা যায় চরিত্রদের মধ্যে।

 এই বইয়ের প্রথম গল্প ‘গন্তব্যে’। গল্পের শুরুতে আর দশটি পরিবারের মতোই সন্তানের টাকা-পয়সা নিয়ে মায়ের অভিযোগ, বাবার কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন, এবং পুরনো দিনের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে বর্তমানের কঠিন জীবনের কদর্য অংশটি প্রকাশ পায়। কিন্তু শেষে এসে যে সন্তানের কাছে মায়ের রানি হয়ে থাকার কথা সে সন্তানের কাছেই আবেদন থাকে মৃত্যুর পরে যদি সুযোগ হয় পুনরায় স্বামীর সংসর্গে ফেরত যাওয়ার। পুত্রকে জানায় মা তার মৃত্যুর মুহূর্তে যখন মুর্দারা এসে চারপাশে ভিড় জমাবে তখন যেন সে তার বাবাকে বলে তার মা অনেক ভালো, তাকে ছাড়া সে আর কোনো পুরুষ মানুষ দেখেনি, কোনো পুরুষের কথা ভাবেনি, সে এবার তাকে নিলে তার মা তার বাবাকে অনেক সমাদর করবে।

এই যে জীবনের সহজ সমর্পণ এ এক অনন্য বোধ। পারিবারিক সম্পর্কের অভিমান কিংবা দূরত্বের শেষে এভাবেও দেয়াল ভাঙা যায়, দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টায় সম্পর্কের গৌরব রক্ষায় এভাবেও হওয়া যায় মায়ের অন্তরঙ্গ বার্তাবাহক। লেখকের মুনশিয়ানা জীবন ভাবনায়। সহজ গদ্য, বিশেষণহীন আঞ্চলিক সংলাপকেও দেওয়া যায় কৃতিত্ব।

‘শরীর’ গল্পে জগৎকে নতুন করে চেনার মাজেজা আছে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মানুষের অবচেতন মন কীভাবে বেঁচে থাকার তীব্র আকাক্সক্ষায় পূর্ণ থাকে তা যেন এ গল্পের কাহিনির ভাঁজে স্বতন্ত্র স্বরে ধ্বনিত। ডাক্তার ফাহমিদার কাছ থেকে তিন মাসের আয়ুষ্কাল জানার পর কথকের ভেতরের জগতে যে পরিবর্তন আসে তা তার অস্তিত্বকে এক গভীরতম প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। প্রশ্ন জাগায় মনে তার এতদিনের সব স্যাক্রিফাইস এবং সম্পর্কের মূল্য আসলে কতটুকু? কথকের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন আরও তীব্র হয় যখন তিনি জয় নামের এক পুরনো প্রেমিকের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। জয়ের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়া এবং পরে তার অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়ার খবর শুনে কথক অনুধাবন করেন যে জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যায়, সেখানে তার অসুস্থতা বা চলে যাওয়া খুব বেশি প্রভাব ফেলে না।

লেখকের ‘একজন ও একজন’ গল্পে দেখা যায় ব্যক্তিসত্তার দ্বৈতরূপ। একজন স্বপ্নভূক, সেই একই জন আবার বাস্তব জীবনে বাঁচে। প্রেমিকার বিয়ের এনগেজমেন্টের খবর পেয়ে সেই বিয়ে ভেঙে দিতে যায়। না, সেটা কল্পনায় ভাবা। বাস্তবে ভাবে, বিয়ে কেবল একটা নরনারীর ব্যাপার না; পেছনকার অভিভাবক, বংশ মর্যাদা, শ্রণি এগুলোর ভূমিকা মুখ্য। সে ভেবে নেয় প্রেমিকার কোথায় কী হলো কিছু আসে যায় না। কিন্তু স্বপ্ন যেমন সত্য না। এই বাস্তবও সত্য না। এই গল্পের একজন প্রেমিকা মণিকাও। এই ‘দুই’ ‘একজন’ সামাজিক জীবনে আলাদাই, কিন্তু ‘একজন’ হওয়ার আকাক্সক্ষা মরে না। বহু বছর পর, মণিকার ক্যানসার সেই পুরনো প্রেমের স্মৃতি ও করুণ কষ্টকে ফিরিয়ে আনে। মণিকা ও নায়কের শেষ কথোপকথন গভীর দুঃখ, অব্যক্ত প্রেম এবং অনুশোচনা প্রকাশ পায় এক হার্দিক নরম স্বরে। গল্পের ভাষা অত্যন্ত আন্তরিক, স্বচ্ছন্দ ও কথ্য ভঙ্গির, যা চরিত্রের ভেতরের জটিল অনুভূতি, যেমন : প্রেম, হতাশা, আর্থিক সংগ্রাম এবং শেষ অবধি মানবিক করুণার মিশ্রণ পাঠকের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেয়।

লেখক সিরাজুল ইসলামের চোস্ত পায়জামা গল্পগন্থে ‘আফসানা’ একটি তীব্র আবেগঘন এবং মনস্তাত্ত্বিক গল্প, যেখানে প্রেম, বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি এবং জীবনের নির্মম সত্য অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আফসানা চরিত্রটি এক অর্থে স্বপ্নের প্রতিশব্দ, যা কথকের ব্যক্তিগত জীবনে একসময় গভীর ছাপ ফেলেছিল। গল্পটি দুটি প্রধান ধারায় প্রবাহিত হয়েছে, একদিকে আফসানার সঙ্গে কথকের অতীত সম্পর্ক, যা ভালোবাসা, জীবন এবং মৃত্যুর এক জটিল সমীকরণে বাঁধা, অন্যদিকে নুজহাতের সঙ্গে বর্তমান দাম্পত্য জীবন। আফসানা ছিল প্রাণবন্ত, যদিও ক্যানসার নামক মারণব্যাধিতে সে দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, যা কথকের জীবনে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। নুজহাতকে আপাতদৃষ্টিতে নিরাসক্ত ও নীরব মনে হলেও, সে প্রতিনিয়ত কথককে আগলে রাখে, এমনকি আফসানা সম্পর্কে কথকের জিজ্ঞাসা নিয়েও তার কোনো অভিযোগ নেই। বরং, সে তাকে শান্তিতে ঘুমোতে দেয় যখন কথক আফসানার কথা বলে। গল্পে ঢাকা শহরের হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং গ্রামের নদীতীরসহ বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা এসেছে, যা চরিত্রগুলোর মনোজগৎকে প্রতিফলিত করে। কথকের হতাশা, আফসানাকে ভুলে থাকার চেষ্টা এবং নুজহাতের নীরব সমর্থন সবকিছু মিলেমিশে এক গভীর মানবিক আবেদন তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত, কথক আফসানার জীবনের মানে উপলব্ধি করতে পারে না, বরং সে নুজহাতের নীরব ভালোবাসা এবং পৃথিবীর নিয়মকানুন না জানার এক গভীর উপলব্ধি নিয়ে একাকিত্বের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। গল্পটি প্রেম ও দুঃখের এক অসাধারণ কাব্যিক দলিল।

 গ্রন্থের নাম গল্প ‘চোস্ত পায়জামা’ কথক আর তার পিতা আলী আক্কাসের আন্তঃসম্পর্কের গল্প পুত্রের ভেতরে পিতা কতদূর পর্যন্ত, কতদিন পর্যন্ত থাকে? পিতার নাটকের পোশাক চোস্ত পায়জামাকে মাঝখানে রেখে জীবনের জটিলতাকে উপলব্ধির প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে এই গল্পের প্লট। কথক যখন শহরের বিভিন্ন পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যে পথগুলোতে পিতা হেঁটে গিয়েছেন এক জন্ম আগে; তখন তার মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে কোথায় যেতে হবে বলে দিয়েছে, আর তিনি সেখানেই যাচ্ছেন। কথকের শৈশবে দেখা পিতার চোস্ত পায়জামা গল্পের শেষে খুঁজে পাওয়া যায় কথক আর স্ত্রী জুলফিয়ার শোবার বিছানার বালিশের তলায়। এই চোস্ত পায়জামাটি যেন তাদের সমস্ত অতীত, স্মৃতি এবং সম্পর্কের ভার বহন করছে। জীবনের জাল পিতা থেকে পুত্রে বিস্তৃত, তা থেকে পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ; তিনি তার অতীত, পিতা, জুলফিয়া কিংবা জীবন কোনো কিছুকেই আর এড়িয়ে যেতে পারবেন না। গল্পটি শেষ পর্যন্ত এক গভীর মানবিক আবেদন এবং নিয়তিকে মেনে নেওয়ার এক নীরব উপলব্ধিতে পর্যবসিত হয়।

‘দেখা’ গল্পের শুরুটা এমন ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম, নাইসের সাথে আমার আর কোনো দিন দেখা হবে না। দেখা হয়ও না।’ অথচ গল্পের পরিণতিতে এসে দেখা যায় কথক বলছে ‘নায়লাকে আমি নাইসের কথা বলব কি না, মনস্থির করতে পারি না।’ অর্থাৎ নিশ্চয়তা থেকে অনিশ্চয়তায় যাত্রা।

আবার ‘রক্তমাংস’ গল্পটি শোনায় ভিন্ন কিছু। দুর্নীতি ও নৈতিকতা, সম্পর্ক ও মানসিক টানাপড়েন, স্বাধীনতা ও পলায়ন এবং সবশেষে বলে ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ যেন গল্পটিকে ব্যক্তিগত সীমার বাইরে রেখেছে।

‘ফেরা’ গল্পে  কথকের শৈশবস্মৃতিতে শরৎগুপ্ত রোড, বেগমগঞ্জ লেনের একটি পুরনো বাড়ি বিশেষ ব্যঞ্জনায় গভীর হয়ে ওঠে পাঠকের চোখে।

‘বড়ো বেদনার মতো’ গল্পের বেদনা এক সময়ের নাম।

অন্যদিকে লাইলি বা প্রেমের গল্পে হারিয়ে ফেলা লাইলি যেন কথকের এক অবদমিত কামনার ফুল, যাকে হারালেও খোঁজার আকাক্সক্ষা নিবৃত হয় না জনমের পর জনম।

এরূপ বহু বিচিত্র বোধ, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর বিস্মৃতির সমারোহে সিরাজুল ইসলামের গল্পেরা রঙিন, শিল্প সৌষ্ঠবেও যেন তারা স্বতন্ত্র। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত